আমার আট আনার শিক্ষকসত্তা: একটি কৈফিয়ত

[প্রশান্ত ত্রিপুরা] মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি কবিতা আছে, The Road Not Taken নামে, যা প্রবাসে শিক্ষার্থী থাকাকালে একসময় আমি আবৃত্তি করতাম, একা। বোদ্ধা মহলে কবিতাটির কোনো গূঢ় অর্থ আছে কিনা জান…

Source: আমার আট আনার শিক্ষকসত্তা: একটি কৈফিয়ত

Posted in General posts | Leave a comment

Welcome to my blogs

I now maintain three separate blogs depending on the language of my posts. Please follow the links below depending on which ones you are interested in:

Thank you.

Posted in General posts | Leave a comment

একটি মাঠ, দুইটি গোলক ও একটি গোলকধাঁধা

আদিবাসী দিবসের ভাবনা*

মাঠ

যে মাঠের কথা বলছি, তার অস্তিত্ব এখন মূলত স্মৃতিতেই। আমার ছোটবেলার একটা বড় অংশ কেটেছে সেই মাঠে। তরুণ বয়সেও বিভিন্ন অবকাশে প্রিয়জনদের সাথে প্রচুর সময় কাটিয়েছি সেখানে। আমি বলছি খাগড়াছড়ির যে গ্রামে আমার জন্ম, সেই খাগড়াপুরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় লাগোয়া মাঠের কথা। আমার স্মৃতিতে অক্ষয় থাকা এই মাঠে একসময় পাড়ার ছেলেরা ফুটবল খেলত নিয়মিত। আমি নিজেও খেলেছি অসংখ্যবার। কিন্তু এখন সেখানে ফুটবল খেলার সুযোগ আর নেই। কারণ মাঠটা অক্ষত নেই আর। ওটার এক পাশে আছে প্রয়াত বাবা-মাসহ গ্রামবাসীদের উদ্যোগে শুরু করা একটা প্রাইমারি স্কুল – যেখানে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল – যেটি সরকারি হওয়ার পর এর দ্বিতল ভবনের চৌহদ্দির মধ্যে চলে যায় মাঠের একটা অংশ, যেখানটায় গাছের ডাল বা বাঁশ দিয়ে বানানো গোলপোস্টে আমরা অনেকেই অনেক গোল দিয়েছি।  স্কুলের পাশে একটা ক্লাবঘর ও একটা কমিউনিটি সেন্টারও এখন মাঠের বেশ কিছু জায়গা নিয়ে নিয়েছে,  যেখান থেকে এক কালে অনেক কর্ণার কিক নিয়েছি আমরা। আর মাঠের পশ্চিম সীমানা আগে যেখানে ছিল, তার উপর দিয়ে এখন চলে গেছে পৌরসভার একটি রাস্তা, যার পাশেই মাঠের মধ্য-পশ্চিম ভাগ জুড়ে এখন একটি স্থানীয় সমিতির ভবন।  আর আমার স্মৃতিময় মাঠের যে অংশটা এখনো ফাঁকা আছে, সেখানে বিশেষ উপলক্ষে বিনোদনমূলক খেলাধূলা বা মঞ্চ বানিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি হয় এখনো, তবে ফুটবল খেলা হয় না। একেতো যথেষ্ট ফাঁকা জায়গা আর নেই, তার উপর নূতন প্রজন্মের মধ্যে ফুটবল পাগল মানুষের হার খুব বেশি বলে মনে হয় না।

Field১ম গোলক

আমার মানসপটে যে দুইটি গোলকের ছবি ভেসে বেড়াচ্ছে, তার একটি হল ফুটবল। স্মৃতিতে মিশে থাকা এই বস্তু, ছোটবেলার খেলার মাঠ – এসব আমার চিন্তায় ঘুরপাক খেতে থাকে বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০১৩ উপলক্ষে আগাম আয়োজিত পাহাড় বনাম সমতলের আদিবাসীদের মধ্যে অনুষ্ঠিত একটা প্রীতি ফুটবল ম্যাচে অংশ নিতে গিয়ে। পাহাড়ি বয়োজ্যোষ্ঠ দলের পক্ষে মাঠে নামার পর কিছু সময়ের জন্য বয়স ভুলে ছোটাছুটি করেছিলাম বায়ুভর্তি একটি গোলকের পেছনে, যেমনটা ঢাকায় বা বিদেশে পড়ালেখা করার সময় খাগড়াপুরে অবকাশ যাপনে গেলে প্রিয়জনদের সাথে বেশ নিয়মিতই করতাম আজ থেকে দুই তিন দশক আগে, বা তারো আগে যখন খাগড়াপুরে বাড়িতে থেকেই লেখাপড়া করতাম।

Kid with football

খাগড়াপুরে খুব ছোট বয়সে প্রথম যে বলগুলো নিয়ে আমরা খেলতাম, সেগুলো গাছে ধরত। আমি বলছি জাম্বুরার কথা। আমাদের স্কুলের পাশেই একটা জাম্বুরা গাছ ছিল, এবং যখন স্কুলে বা পাড়ায় কোন ফুটবল ছিল না, আমরা সেখান থেকে ফল পেড়ে নিয়ে খেলতাম। এরপর প্রথম যখন সবাই মিলে চাঁদা তুলে একটা ফুটবল কিনেছিলাম – তখন আমি হয়তবা টুতে পড়তাম – আমার মত বয়সের ছেলেদের মধ্যে রীতিমত একটা উৎসবের ধুম পড়ে গিয়েছিল। সেই বল একদিন হঠাৎ করে ফেটে গেল – উপরের চামড়ার আবরণে সেলাই খুলে গিয়েছিল এক জায়গায়, এবং  সেখানে কেউ একজন লাথি মারার সময় তার পায়ের নখ লেগে ব্লাডার ফেটে গিয়েছিল জোর আওয়াজ করে – যে ঘটনা ছিল পরবর্তী কয়েকদিন আমাদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মনে পড়ে, কেউ কেউ তখন বলে বেড়াচ্ছিল, বলটি ফাটার সময় নাকি তারা আগুনের একটা হল্কা উড়ে যেতে দেখেছিল!

আমার বিশ্বাস, ফুটবলের পেছনে দৌঁড়িয়ে ছোটবেলায় অনেক সময় কাটিয়েছেন,  এমন অনেকেরই এ ধরনের নানান মজার স্মৃতি আছে। তবে স্মৃতিগুলো যতটা না ফুটবল নামক বস্তুটার, তার চাইতেও বেশি তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সম্পর্ক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার। একদিকে বন্ধুত্ব, আরেকদিকে প্রতিযোগিতা। আমাদের বেলায় প্রতিযোগিতার একটা ভেদরেখা ছিল গ্রামের বুক চিরে বয়ে যাওয়া খাগড়াছড়ি নামের ছোট ছড়া, যার একপাশে ছিল গোলাবাড়ি এবং আরেক পাশে  পেরাছড়া নামের দুটি আলাদা মৌজা। এই এককের প্রশাসনিক ও সামাজিক গুরুত্ব বড়দের কাছে তখনো নিশ্চয় ছিল, যে কারণে তা ছোটদের খেলায় ঢুকে পড়েছিল। যাহোক, এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে ফুটবলকে আমরা দেখতে পারি স্থানিক সমাজের, বা কমিউনিটির, স্মারক ও প্রতীক হিসাবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পেছনে ফেলে আসা একটা সময়ের কথা, যখন ‘কমিউনিটি’ শব্দটা আমরা হয়ত জানতাম না, কিন্তু তার বাঁধনেই টানা ছিল আমাদের চেনা জগতের অনেকখানি সীমানা।

২য় গোলক

দ্বিতীয় যে গোলকের কথা আমি ভাবছি, তা আপনার আমার – সব মানুষের – বাসস্থান, এই বিশ্বব্রহ্মান্ডে আমাদের সবার ঠিকানা। আমি বলছি পৃথিবী নামক গ্রহের কথা, যেখানে চেপে বর্তমানে সাতশ কোটি মানুষ, এবং সৃষ্টির অপরাপর সকল জীব, ভেসে চলছে মহাশূন্যে। অবশ্য পৃথিবী যে গোল, এবং সূর্যের চারিদিকে ঘুরতে ঘুরতে সৌরমন্ডলের অংশ হিসাবে মহাশূন্যে ছুটে চলছে, এই বিষয়টাতো মানুষ বুঝতে শিখেছে এই সেদিন। তারপরও বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে ব্যাপারটা হয়ত এখনো অজানা বা দুর্বোধ্য।  নিজের বেলায় আমার মনে পড়ে, ক্লাস সিক্সে ওঠার পর একদিন যখন আমাদের ভূগোল বা বিজ্ঞানের শিক্ষক ব্ল্যাক বোর্ডে একটা গোল বৃত্ত এঁকে দেখিয়েছিলেন, পৃথিবীটা গোল, এবং আমরা থাকি সেই গোলকের পৃষ্ঠদেশে, আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম বড়দের অজ্ঞতা দেখে। স্পষ্ট মনে আছে, আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, গোলকের নীচের দিকে যারা বা যা কিছু আছে, পড়ে যাবে না?  এই সামান্য বিষয়টা যে শিক্ষকের মাথায় আসে নি, তা ভেবে আমি অবাক হয়েছিলাম এবং মনে মনে ঠিক করেছিলাম, বড় হয়ে প্রমাণ করব যে পৃথিবী গোল হতে পারে না!

যাহোক, আদিবাসী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত ফুটবল ম্যাচ খেলার পর একদিকে যেমন খাগড়াপুরের ফেলে আসা দিনগুলোতে ফিরে গিয়েছিলাম, তেমনি একটা পর্যায়ে আমার চিন্তায় সমগ্র পৃথিবীও ধরা দিতে শুরু করেছিল। আমার মনে হতে থাকে, ‘আদিবাসী’ ধারণার আবেদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হলে গ্রামের পরিসর থেকে শুরু করের বৈশ্বিক পর্যায় – সকল বলয়েই এটিকে অর্থবহ করে তুলতে হবে, যাতে করে চাইলে যে কেউ কোন না কোন এক স্তরে নিজেকে খুঁজে পাবে আদিবাসী ধারণার মধ্যে। কথাটা  খোলাসা করার আগে একটু বলে নেই শিরোনামে উল্লেখ করা গোলকধাঁধার কথা।

গোলকধাঁধা

যে গোলকধাঁধার কথা আমি বলছি, তা মূলত রাজনীতির, যার আবার দুটি দিক রয়েছে – এক দিকে কায়েমি স্বার্থের রাজনীতি ও নগ্ন ক্ষমতার আস্ফালন, আরেক দিকে শব্দের রাজনীতি, যার সাথে মিশে আছে সংস্কৃতি ও ইতিহাস নির্মাণের বিবিধ ধারার অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব।  ‘আদিবাসী’ বলতে যাদের আমরা বোঝাচ্ছি, তাদেরকে প্রান্তিক ও অধস্তন, এমনকি নিশ্চিহ্ন, করার প্রক্রিয়া চলে আসছে বিভিন্ন ভাবে সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে – কখনো অস্ত্রের জোরে, কখনোবা কলমের খোঁচায়, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে স্রেফ জনস্রোতের তোড়ে। ইতিহাসের ঘূর্ণাবর্তের মুখে আদিবাসীদের কেউবা পালিয়ে বেড়িয়েছে দীর্ঘকাল, আবার কেউবা রুখে দাঁড়িয়েছে যখন যতটুকু পেরেছে, কিন্তু তাদের সংগ্রাম এখনো শেষ হয় নি। এই সংগ্রাম একদিকে হল তাদের টিকে থাকার মূল সম্বল যে ভূমি, তার যেটুকু এখনো তাদের জিম্মায় আছে, তা ধরে রাখার। আরেক দিকে রয়েছে আত্মপরিচয়ের সংকট মোকাবেলা – যে সংকটের মূলে ছিল, রয়েছে, উত্তর-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রক্রিয়ায় তাদেরকে বাদ দেওয়া। এসব সংকট থেকে উত্তরণের অংশ হিসাবে এদেশের আদিবাসীরা দুই দশক আগে আশ্রয় খুঁজতে শুরু করে জাতিসংঘ প্রণীত ‘ইনডিজেনাস পিপল’ ধারণার ছাতার নীচে।

১৯৯৩ সালকে যখন জাতিসংঘ International Year of the World’s Indigenous People হিসাবে ঘোষণা দিয়েছিল, এদেশের আদিবাসীরা অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ও আগ্রহের সাথে তা পালনের উদ্যোগ নিয়েছিল। কাগজে কলমে বাংলাদেশ তখন ‘স্বৈরাচার মুক্ত’ হয়েছে, তাই আদিবাসীদের অনেকের মধ্যে একটা প্রত্যাশা ছিল যে ‘গণতান্ত্রিক’ সরকার বর্ষটি উদযাপনে এগিয়ে আসবে। বাস্তবে তা হয় নি। এমতাবস্থায় তৎকালীন বিরোধী দলের সাংসদ ছিলেন এবং বর্তমান সরকারে প্রতিমন্ত্রী পদে আসীন রয়েছেন, এমন দু’জন বিশিষ্ট আদিবাসী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নেতৃত্বে ‘আন্তর্জাতিক বিশ্ব আদিবাসী বর্ষ উদযাপন’  উপলক্ষে ডিসেম্বর ১৮, ১৯৯৩ তারিখে ঢাকায় আয়োজিত একটি সেমিনারে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে আমি লিখেছিলাম, “বাংলাদেশে জাতিসংঘ ঘোষিত বর্ষটি উদযাপনের কোন সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয় নি, এই যুক্তিতে যে এদেশে কোন indigenous জনগোষ্ঠী নেই। কিন্তু একজন গারো, সাঁওতাল বা ম্রোর কাছে এই সরকারি ব্যাখ্যা তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করারই নামান্তর। ­ এতদিন তাকে আদিবাসী আখ্যায় ভূষিত করে হেয় করা হয়েছে। আর আজ যখন সে এই পরিচয়কে সগৌরবে ধারণ করে বিশ্বের দরবারে মাথা তুলতে চাইছে, তখন তার সরকার তাকে বলছে, সে নিজেকে indigenous বলে দাবী করতে পারে না।”

তো, ১৯৯৩ থেকে দুই দশক ফাস্ট ফরোয়ার্ড করে যখন সাম্প্রতিক কালে ফিরে আসি, কি দেখি আমরা? আমরা দেখি ২০১১ সালের জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকাস্থ কূটনীতিকদের একটি সভায় ডেকে এনে বলছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘উপজাতীয়’ (tribal)-দের ethnic minority বলা যেতে পারে, কিন্তু তাদের indigenous বলা যাবে না।  যে সরকারকে আদিবাসীদের প্রতি সহানুভূতিশীল বলে ভাবা হত, তার একজন প্রতিনিধির মুখে দুই দশক আগের বস্তাপঁচা যুক্তি নূতন করে শুনতে হবে, তা অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত, হতাশাব্যঞ্জক ও বিভ্রান্তিকর। অনেকেই মেলাতে পারছিলেন না, যখন সরকারে রয়েছেন চারজন প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার আদিবাসী সাংসদ,  এবং সরকার প্রধান পদে রয়েছেন এমন একজন জননেত্রী যিনি ১৯৯৩ সালে বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসাবে, এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবেও, বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে বাণী দিয়েছিলেন, তখন কি করে আবার নূতন করে একটি পুরানো রেকর্ড বাজানো হয় যে ‘উপজাতীয়রা এদেশের আদিবাসী নয়’? … এ লেখা লিখতে বসার পর ফেসবুকে একটা খবর চোখে পড়ল, বান্দরবানে নাকি একটা লিফলেট বিলি করা হচ্ছে এই মর্মে যে, “পাহাড়িরা না, বাঙালিরাই পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী,” যা অনেকটা দু’বছর আগে দেওয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণারই প্রতিধ্বনি!  এই অবস্থা  নিঃসন্দেহে পরিহাসমূলক, সেসাথে গভীর রকমের হতাশাব্যঞ্জকও – ঘুরে ফিরে একটা নিরর্থক বিতর্কের গোলকধাঁধায় আটকে আছে এদেশের অনেক মানুষ।

আদিবাসী ধারণা নিয়ে নূতন ভাবনার তাগিদ

বিভিন্ন কারণে সাম্প্রতিক কালে ‘আদিবাসী’ ধারণা নিয়ে নূতন করে ভাবছি আমি। এবং এটা নূতন করে উপলব্ধি করছি, যে, এই ধারণার মর্মার্থকে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে না পারলে, এবং এটি নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তির নিরসন করতে না পারলে, যে লক্ষ্যে এটি আমরা ব্যবহার করছি তা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে যাবে। … আদিবাসী ধারণার মর্মার্থ ও আবেদন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে হলে গ্রামের পরিসর থেকে শুরু করের বৈশ্বিক পর্যায় – সকল ক্ষেত্রেই এটিকে এমনভাবে অর্থবহ করে তুলতে হবে যাতে চাইলে যে কেউ কোন না কোন এক স্তরে নিজেকে খুঁজে পাবে আদিবাসী ধারণার মধ্যে। এটি মোটেও কঠিন নয়। আদিবাসী ধারণা যে আপেক্ষিক, স্থান-কাল-প্রেক্ষিত নির্ভর, তা নূতন কোন কথা নয়। এ প্রসঙ্গে আমি ১৯৯৩ সালেই লিখেছিলাম:  “স্থান ও কালের সীমানা কিভাবে বেঁধে দেওয়া হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে কোন প্রেক্ষিতে কাদের আমরা indigenous বলতে পারি।  আমরা যদি সুদূর প্রাগৈতিহাসিক অতীতে চলে যাই তাহলে indigenous কথাটি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। সেক্ষেত্রে বড়জোর এটুকু বলা যায় যে, সব মানুষই এই পৃথিবীর indigenous বাসিন্দা, অর্থাৎ আমরা কেউ স্বর্গ বা ভিন গ্রহ থেকে আসা কারও বংশধর নই, বরং আমাদের সবারই রয়েছে অভিন্ন এক [আদি] উৎস [যা রয়েছে] এই পৃথিবীর বুকেই কোথাও, খুব সম্ভব আফ্রিকায়…।” এসব কথা বলার অর্থ অবশ্য এই নয় যে, আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সুনির্দিষ্ট কিছু ভৌগোলিক এলাকার প্রেক্ষিতে কোন জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসাবে শনাক্ত করা অসম্ভব, বা তা করা ঠিক হবে না। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট, স্থানিক ও জাতীয় পর্যায়ে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের সীমানা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে বৈশ্বিক প্রেক্ষিতটাও সব সময় মাথায় রাখতে হবে।

প্রকৃতপক্ষে, আদিবাসীদের অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে যে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যত জড়িয়ে আছে, এবং মানুষ হিসাবে যে আমরা সবাই এক – সবাই পৃথিবীর আদিবাসী –  সে উপলব্ধিকে আরো ছড়িয়ে দিতে হবে। অবশ্য সচরাচর খুব কম মানুষই পুরো পৃথিবীকে নিজের মনে করে। তেমন মনে করার উপলক্ষ বা কারণও খুব একটা ঘটে না। পৃথিবীর সব মানুষই কম বেশি ব্যস্ত যে যার মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে – যার নেই সে তা খুঁজে বেড়ায়, আর যাদের আছে তার দিন চলে যায় তা সামলে রাখতে। এর বাইরে সামষ্টিকভাবে বেশির ভাগ মানুষ বড় জোর নিজ নিজ ‘দেশ’ নিয়ে মাথা ঘামায়, যার মাত্রা ও সীমানায় আবার হেরফের দেখা যায় স্থান-কাল-পাত্র ভেদে। যেমন, বাংলাদেশীদের অনেকের কাছে এই ‘দেশ’ বলতে এখনো নিজেদের গ্রাম বা জেলা, বা বড় জোর সমগ্র বাংলাদেশ। কিন্তু গোটা পৃথিবীকে ‘দেশ’ হিসাবে বিবেচনা করার মত কোন বাস্তব কারণ বা পটভূমি সেভাবে তৈরি হয় নি কোথাও।  আসলে কি নেই? যদি আমরা জলবায়ু পরিবর্তন ও বর্তমান বিশ্বায়নের গতিপ্রকৃতি, সমস্যা, সম্ভবানা ইত্যাদি নিয়ে ভাবি, তাহলে পুরো গ্রহ, বা আমাদের সবার ‘ধরিত্রী মাতা’ নিয়ে যে এ বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের মাথা ঘামানো দরকার, তা বুঝতে কষ্ট হয় না। এ প্রসঙ্গে বিশ বছর আগেই যেমনটা লিখেছিলাম, “প্রগতির যে ধারণা পাশ্চাত্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল, তারই শিকার আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা। কিন্তু এই প্রগতির সীমা ও বিপদ আজ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমাজনের অরণ্যভূমি নিঃশেষ হওয়ার সাথে সাথে সেখানকার আদিবাসীরা যেমন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে নির্মূল হয়ে যাচ্ছে, তেমন গোটা বিশ্বের পরিবেশগত ভারসাম্যেরও ক্ষতি হচ্ছে।”  এ ধরনের উপলব্ধির আলোকেই বিশ্বব্যাপী আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রক্ষার কাজে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

স্মৃতির শেকড় আর স্বপ্নের মহাকাশের যোগসূত্র হিসাবে আদিবাসী ধারণা

ফুটবল আর পৃথিবী – দুটো গোলক নিয়েই মানুষ কাড়াকাড়ি করে। একটার বেলায় গোলকের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা তা করি, আরেকটার বেলায় গোলকের গায়ে চড়ে। ফুটবলের বেলায় আমরা জানি, কিছু নিয়ম মেনে চললে খেলা কতটা উপভোগ্য হতে পারে, এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বন্ধুত্ব কত দৃঢ় হতে পারে। আর ফুটবল যারা ভালবাসে, তারা ওটিতে লাথি মারে প্রয়োজনে, কিন্তু খেলা শেষে বল তুলে নেয় বুকের কাছে। ছোটবেলায় আমাদের কেনা প্রথম বল যখন ফেটে গিয়েছিল আমাদের অসচেতনতায়, আমরা সবাই খুব মন খারাপ করেছিলাম। অন্যদিকে এই পৃথিবী – ধরণী – আমাদের মা। আমরা মানব সন্তানরা তার গায়ে চড়ে খেলা করছি, তাকে লাথি মারছি, আর নিজেরা ঝগড়া করছি, কিন্তু সবাই কিছু নিয়ম মেনে না চললে যে রুগ্ন মায়ের অকাল মৃত্যু আমরা ডেকে আনব, এই উপলব্ধির আলোকে এখন আমাদের সচেতন হতে হবে। উল্লেখ্য, এমন সচেতনতা কিন্তু সহজাতভাবেই মিশে আছে অনেক আদিবাসী সংস্কৃতির গভীরে। কাজেই আদিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা করা, তাদের সংস্কৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়া, খুব জরুরি। চীন বা ভারতের মত দেশ, বা এমন কি বাংলাদেশ, যখন বিশ্ববাসীকে বলে, “আমরা সবাই আদিবাসী, কাজেই আলাদা করে কাউকে আদিবাসী নাম দিয়ে তাদের অধিকার সুরক্ষার কোন দরকার নেই”, আর হাঁটতে থাকে ঔপনিবেশিক মননের ইউরোপীয়দের দেখানো পথে, তখন আমাদের বুঝতে হবে, ধরিত্রী মাতার সামনে সমূহ বিপদ। আর কেউ না বুঝুক, আদিবাসীরা তা বোঝে, কারণ মায়ের সাথে তাদের নাড়ির টান এখনো আছে। মাকে রক্ষায় তারাই এগিয়ে এসেছে, আসতে থাকবে, সবার আগে।

শেষ করব আমার স্মৃতির মাঠ যেখানে আছে, সেই খাগড়াপুর গ্রাম বা খাগড়াছড়ি শহর এখন আমার কাছে কি অর্থ বহন করে, তা নিয়ে আমার একটা সাম্প্রতিক উপলব্ধির কথা উল্লেখ করে। সেটা আমি তুলে ধরেছিলাম এ বছরের শুরুর দিকে ফেসবুকে পোস্ট করা খাগড়াছড়ির একটা পুরানো ছবি ও তার উপর লেখা কিছু কথা দিয়ে। সেখানে যেটা বোঝানোর চেষ্টা করেছি – পাঠকরা নিশ্চয় আমার সাথে একমত হবেন – কখনো যদি মানুষ মহাশূন্যে পাড়ি দেয়, তখন নিশ্চয় পুরো পৃথিবীকেই তার নিজের বাড়ি মনে হবে।

Khagrachari-My home 8মহাশূন্যে আমরা বাস্তবে সহসা যাই বা না যাই, আমাদের কল্পনায়, আমাদের স্বপ্নে, এখনই চলে যেতে পারি, যেমনটা গতবছর সান্তুআতে আমি লিখেছিলাম ‘ত্রিপুরাদের মধ্যে কে প্রথম মঙ্গল গ্রহে যাবে?’ নামের একটা রচনায়। পাঠক, আপনি যদি ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পান চেতনার কোন না কোন স্তরে, আপনি স্বপ্ন দেখছেনতো নূতন কক্ষপথে বিচরণের?

Wansukdi nokha sakao kagwi, phainai jorao thangwi.  Samung tangdi hago achugwi, tabok! <<<চিন্তা করুন আকাশে উঠে, আগামীতে গিয়ে। কাজ করুন মাটিতে বসে, এখন!>>> ~~Think globally, act locally! Think ahead, act now!~~~

 * খাগড়াছড়ি থেকে প্রকাশিত ‘সান্তুআ জার্নাল’-এর বিশ্ব আদিবাসী দিবস ২০১৩ সংখ্যার জন্য লেখা ‘একটি মাঠ, দুইটি গোলক ও একটি গোলকধাঁধা: আদিবাসী দিবসের ভাবনা’ শিরোনামের একটি রচনার সংক্ষেপিত রূপ।

Posted in My articles (Bangla) | 2 Comments

লেখার চিঠিগুলি: একটি স্বপ্নের গল্প

গল্প শুরুর আগে

লেখা একজন ত্রিপুরা নারীর নাম। সম্প্রতি তার সাথে আমার দেখা ও কথা হয়েছে, এবং তার কাছ থেকে একটা চিঠিও পেয়েছি আমি। তবে এসব ছিল স্বপ্নে। পরে স্বপ্ন থেকে জেগে ওঠার পর সত্যিই একটা চিঠি পাই, লেখার কাছ থেকে, যেখানে প্রথম দেখা স্বপ্নের কথা আছে…।  লেখা তার চিঠিতে লিখে রেখে গেছে ভালবাসা ও অন্যান্য শব্দ দিয়ে সাজানো কিছু মন্ত্র। এসব মন্ত্র কিসের, জানতে হলে আপনাকে গল্পটা পড়তে হবে। তবে গল্পটি শুধু তাদের জন্য, যাদের স্বপ্ন দেখার সাহস আছে, আর আছে আগামীর উপর বিশ্বাস।

***

লিমাতে পরিচয়

লেখার সাথে আমার পরিচয় ২০৬২ সালে। মানে, সেটাতো ভবিষ্যতে! হ্যাঁ, ঠিক তাই, আমরা আজ থেকে উনপঞ্চাশ বছর পরের একটা সময়ের কথা বলছি। আমরা ঘুরে বেড়াচ্ছি স্বপ্নের দুনিয়ায়, যেখানে সবই সম্ভব। কাজেই গল্পটা শুনতে থাকুন। তবে লেখার পরিচয় দেওয়ার আগে আমি নিজের পরিচয়টা একটু দিয়ে নেই। আমার নাম নখা। নখা ত্রিপুরা। আমি একজন নভোচারী, মঙ্গলগ্রহে আসা যাওয়া করি, তবে বিভিন্ন মিশনের ফাঁকে সুযোগ পেলে আদি-আদিবাসীদের সাথে সময় কাটাই পৃথিবীতে। আদি-আদিবাসী হল তারা, যারা ২০৩২ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আদিবাসী নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু এরপর পৃথিবীতে দুঃসময় নেমে আসে, কারণ অন্য একটা গ্যালাক্সি থেকে আসা একটা প্রজাতি পৃথিবী দখল করে নেয়। তারা হুবহু মানুষের মত দেখতে, সেভাবেই নিজেদের জেনেটিক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে আলাদা করে চেনার একমাত্র উপায় হল তাদের চোখ, যেখানে কখনো খুশির ঝলক বা আশার ঝিলিক দেখা যায় না, যেমনটা মানুষের বেলায় দেখা যায়। মানুষের চেহারায় ঘুরে বেড়ানো এই ভিনগ্রহীদের ডাকা হয় মচোভি নামে, যা হল ‘মড়া চোখের ভিনগ্রহী’ কথার সংক্ষেপ।

শুরুর দিকে মচোভিরা পৃথিবীর প্রধান মহানগরীগুলি দখল করে নেয়। এসব জায়গার মানুষদের শরীর ও মস্তিষ্কের দখল নিয়ে নেওয়া মচোভিদের জন্য খুবই সহজ ছিল খাদ্যাভ্যাস, জীবন যাপন পদ্ধতি, পরিবেশ দূষণ ইত্যাদির ফলে তাদের বিশেষ কিছু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাওয়াতে। এদিকে, আদিবাসী বলতে ২০৩২-এর আগে যাদের বোঝাত, তাদের অনেকের মধ্যেই এই প্রতিরোধ ক্ষমতাগুলি অটুট ছিল, ফলে মচোভিরা তাদেরকে সহজে কাবু করতে পারে নি। বিষয়টা মঙ্গলগ্রহে থাকা বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করার পর মচোভিদের প্রতিরোধে সক্ষম যেসব আদিবাসী সম্প্রদায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকায় ছড়িয়ে ছিল, তাদেরকে আদি-আদিবাসী বলার রেওয়াজ চালু হয়। আদি-আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে গড়ে তোলা হয় পৃথিবীতে মচোভিদের প্রতিরোধের প্রধান দুর্গগুলি। তবে মহানগরীগুলিতেও মচোভিদের নজর এড়িয়ে বেশ কিছু মানুষ প্রতিরোধের গোপন দুর্গ গড়ে তুলেছিল, যাদেরকে সাধারণভাবে ‘আদিবাসী’ বলে ডাকা শুরু করে মঙ্গল থেকে মচোভিদের প্রতিহত করতে আসা মানুষেরা।

আমার বাবা ছিলেন বাংলাদেশের তিন্দু নামের একটা জায়গায় জন্মানো আদি-আদিবাসী, জাতিতে ত্রিপুরা, এবং মা ছিলেন চিম্বুক পাহাড়ের কাছে জন্মানো আরেক আদি-আদিবাসী, যার বাবা ছিলেন একজন খুমি, এবং মা ম্রো।  আমার জন্ম ২০৩৩ সালে, এবং যখন বোঝা গেল আদি-আদিবাসীদের রয়েছে মচোভিদের প্রতিরোধ করার বিশেষ ক্ষমতা, রেমাক্রি এলাকায় আদি-আদিবাসী ও আদিবাসী মানুষেরা মিলে যে দুর্গ গড়ে তোলে, সেখানেই আমি বড় হয়েছি। এরকমই আরেকটা দুর্গ রয়েছে সাজেকে, যেখানে আমার থেকে বয়সে পাঁচ বছরের ছোট লেখার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। তার বাবা মা দু’জনেই ত্রিপুরা পরিচয় দিতেন, তবে তার বাবার মা নাকি পাংখোয়া ছিলেন। লেখার বাবা-মা বেঁচে আছেন, তবে আমার বাবা-মা দু’জনেই মারা যান আমার বয়স যখন নয় বছর, তখন, মচোভিদের ঘাঁটিতে গেরিলা হামলা চালাতে গিয়ে।

লেখার কথা আমি আগে কারো কাছে শুনি নি। আমি আসলে রেমাক্রি ছাড়ার পর ব্যস্ত ছিলাম পৃথিবীর বিভিন্ন আদি-আদিবাসী অধ্যুষিত ও মচোভি-মুক্ত এলাকার দুর্গগুলোতে প্রশিক্ষণ নিতে। ২০৬২ সালে লিমাতে গিয়েছিলাম মচোভিদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযানে নামার জন্য মঙ্গলে প্রশিক্ষণে যাবে, এমন একটা দলে যোগ দিতে। আমাকে মনোনীত করা হয় দলনেতা হিসাবে। আমি জানতাম দলে আদিবাসী ও আদি-আদিবাসী, দুই ধরনের মানুষই থাকবে, তবে কারো নাম পরিচয় জানতাম না আগে। লিমাতে গিয়ে দলের সবার মত লেখার সাথেও পরিচয় হল। কিন্তু তার সাথে সাক্ষাত ছিল আমার জন্য একটা বিশাল ধাক্কা, যার জন্য মোটেও আমি প্রস্তুত ছিলাম না। আগে আমার জীবনের ব্রত  ছিল একটাই, পৃথিবীকে মচোভিমুক্ত করা। আর তা করার জন্য পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে, বা দূর কোন গ্রহে, যখন যেখানে দরকার, ছুটে যেতে সদা প্রস্তু ছিলাম আমি। তাই কারো সাথে কখনই প্রেম বা বিয়ের বন্ধনে জড়াব না, এমনই ছিল আমার পণ। কিন্তু লেখাকে প্রথম দেখার মুহূর্তেই আমার ভেতরে কিভাবে যেন বিরাট ধরনের ওলটপালট হয়ে যায়, এমন একটা অনুভূতি আমার সমগ্র সত্তাকে গ্রাস করে ফেলে যেরকম অভিজ্ঞতা আমার জীবনে আর কখনো হয় নি। লেখা যে একজন ত্রিপুরা মেয়ে, সেটা তখনো আমার জানা ছিল না। কাজেই সেও ত্রিপুরা, আমিও ত্রিপুরা – এমন কোন চিন্তা থেকে তার প্রতি আমার বিশেষ আকর্ষণ বা আগ্রহ জন্মেছিল, বিষয়টা এরকম কিছু ছিল না। বরং দেখার মুহূর্তেই যে অনুভূতি হয়েছিল, তা ঠিক ভাষায় বোঝানো যায় না। লেখাকে দেখার মুহূর্ত থেকেই আমার মনে হতে থাকে তার সাথে আমার বুঝি জন্ম জন্মান্তরের পরিচয়।  লিমাতে আমাদের দেখা হবে, আমরা একসাথে মঙ্গলে যাব, এ বুঝিবা ছিল নিয়তির লিখন। যে ধরনের কথা আমাদের পূর্বসূরীদের অনেকে বলত বলে শুনেছি, পড়েছি। যাহোক, লেখার প্রতি আমার প্রথম-দর্শনে-প্রেম ব্যাপারটা দলের প্রধান প্রস্তুতি-উপদেষ্টা মার্শা !কিং র নজর এড়াল না (ডঃ !কিং-এর আদি নিবাস ছিল কালাহারি এলাকায়, জাতিতে !কুং সান, ‘!’ অক্ষরটা ওদের ভাষার একটা ধ্বনি।)। তিনি একদিন প্রশিক্ষণের ফাঁকে আমাকে ডেকে ককবরকে বললেন (ভাষাটা তিনি শিখেছিলেন ত্রিপুরার জম্পুই পাহাড়ের দুর্গে এক বছর থাকার সময়), ‘আমি তোমার মনের কথা বুঝি। কিন্তু মনে রেখো, মিশনটা ঠিকমত শেষ করাই বড় কথা।’ আমিও জানতাম, তাই মুখ ফুটে কিছু বলি নি কখনো। এভাবে প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। অবসরে আমরা গল্প করি। ‘উই-সুকুই’ খেলি (ত্রিপুরাদের সুকুই খেলার ‘উই’-সংস্করণ, যেটা সবার নিয়মিত ব্যায়াম অনুশীলনের অংশ।)  এভাবে প্রশিক্ষণ চলার তেরদিনের মাথায় লেখা হঠাৎ একদিন লানচের সময় আমাকে বলে বসে, ‘তুমি কি আমাকে ভালবাস? আমাকে পেতে চাও? আমাকে পাবে এক শর্তে। তোমাকে আগে নিশ্চিত করতে হবে, তোমার বাবা-মা, তাদের বাবা-মা, সবাই আমাকে ভালবাসবে। এই নাও একটা চিঠি। এখানে সব লেখা আছে।’

প্রথম চিঠি, আমার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন

‘নখা, তোমার সাথে প্রথম দেখার মুহূর্তেই আমি বুঝেছিলাম, তুমি যেমন মনের গভীরে ঠিক আমাকেই খুঁজছিলে, আমিও…।’ এটুকু পড়ার পর হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে যায়। আমি নিজেকে আবিস্কার করি হোস্টেলে, চেয়ারে বসা অবস্থায় পড়ার টেবিলে ভাঁজ করা দু’হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হোস্টেল মানে মার্টিন হল, নটরডেম কলেজের ছাত্রাবাস। সেখানে আমি থাকি আরো দু’জন বন্ধুর সাথে – একজন মধুপুরের চুনিয়া গ্রামের তুরা ম্রি, আরেকজন রাজশাহীর কাঁকনহাটার ইরা হেমব্রম। আমার সামনে খোলা ল্যাপটপ। ‘বিজ্ঞান ও ইতিহাস’  কোর্সের একটা এসাইনমেন্ট নিয়ে কাজ করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কোর্সটা পড়ান আনা টুডু, আমাকে খুবই স্নেহ করেন। তিনি খুব আকর্ষণীয়ভাবে, আবেগের সাথে, পড়ান কলম্বাসের তথাকথিত আমেরিকা আবিস্কারের পর কিভাবে ইউরোপীয়রা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন কিভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার জীববৈচিত্র্য পাল্টাতে শুরু করে, আদিবাসীদের লোকজ জ্ঞান জড়ো করে ইউরোপের বিজ্ঞানীরা কিভাবে নিজেদের ‘আবিস্কার’ বলে চালাতে শুরু করে – এরকম অনেক বিষয়।  তিনি একটা এসাইনমেন্ট দিয়েছেন, “আগামী দুই বছরে, অর্থাৎ ২০২০ সাল নাগাদ, পৃথিবীর জনসংখ্যা ৮০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। ধরা যাক, এই বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে গড়ে প্রতি পরিবারের একটি গাড়ি, একটি ফ্ল্যাট, একটি টিভি…অর্থাৎ শাপলা চত্ত্বরের কাছে গিয়ে রাস্তায় ঝটিকা জরিপ চালিয়ে ‘উন্নত’ জীবনযাত্রা সম্পর্কে পথচারীদের যে গড়পরতা ধারণাগুলো তোমরা নিয়ে এসেছ, তার সবই। এই পৃথিবী কি এমন জীবনযাত্রার ভার সইতে পারবে? সেদিন থানচি থেকে আসা ম্রো জুমিয়া দম্পতি সেমিনারে যে কথাগুলো বলেছিলেন, তাঁদের কথা, ক্লাসের পড়া, এবং কলেজের ই-লাইব্রেরি ঘেঁটে পাওয়া তথ্য – এগুলো মিলিয়ে একটা পেপার লিখে নিয়ে আসবে ৫০০০ শব্দের মধ্যে।” এই এসাইনমেন্টের উপরই কাজ করছিলাম, এবং ফাঁকে লেখার সাথে কথা বলছিলাম ফেসবুকে। ওর বাড়ি সাজেক। আমার সমবয়সী। খুবই মেধাবী। এখন পড়াশুনা করছে বেইজিং-এর একটা কলেজে, যেটাতে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেকেই পড়তে আসে মাধ্যমিক শেষ করেই। ওর ইচ্ছা মঙ্গলগ্রহ-ভিত্তিক যে ‘স্পেস বায়োলজি ল্যাব’ চালু হওয়ার কথা ২০৩০ সাল নাগাদ, সেখানে যোগ দেওয়া। তো, ঘুম থেকে উঠে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে দেখি, ফেসবুকে একটা মেসেজ নূতন এসেছে, পাঠিয়েছে লেখা। সে লিখেছে, ‘ই-মেইলে একটা চিঠি পাঠিয়েছি। পড়ে দেখো। খুব জরুরী।’ আমি দেরী না করে ইমেইল খুলে পড়তে শুরু করলাম লেখার পাঠানো চিঠি।

দ্বিতীয় চিঠি, ভালবাসার মন্ত্র

‘প্রিয় নখা, তোমার সাথে আমার ঠিকই দেখা হয়েছিল লিমায়। চমকে উঠলে? আমি জানি বিষয়টা বোঝানো এবং বিশ্বাস করানো কঠিন। কিন্তু আজ তোমাকে এমন আরো কিছু বিষয় বলব, যেগুলো আরো অবিশ্বাস্য। আমার তাড়া আছে, তাই খুব সংক্ষেপে বলছি। বিষয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং জরুরি। তুমি প্রত্যেকটা কথা খুব মন দিয়ে পড়বে, এবং এই মেইল পড়া হলেই মুছে ফেলবে। ঘটনা হল, মচোভিরা আমাদের আশেপাশেই ঘুরছে। তারা কয়েকশ বছর হল – কেউ বলে তিন বা পাঁচ হাজার বছর আগে থেকেই – পৃথিবীতে নিজেদের বিস্তার করে চলছে। মঙ্গলের বিজ্ঞানীরা ঠিক নিশ্চিত নন কিভাবে এটা ঘটেছে। তবে তারা একটা ব্যাপারে নিশ্চিত যে দূর গ্যালাক্সি থেকে মচোভিরা প্রথমে এসেছিল অণুজীবের আকারে, তারপর কিভাবে যেন অনেক মানুষের শরীর ও মনের দখল নিয়ে নেয়, এবং আস্তে আস্তে তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। নৃবিজ্ঞানীদের ধারণা, মচোভিদের কারণেই রাষ্ট্র ও বাজার ব্যবস্থার এত দ্রুত বিস্তার ঘটেছে মানুষের ইতিহাসে। তাছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে ধর্ম, সব প্রতিষ্ঠানেই মচোভিরা বিশ্ব জুড়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে। মচোভিরা মানুষের শরীর মনের দখল নিয়ে নেয় অভিনব পন্থায়। নির্দিষ্ট কিছু প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস বহন করে তাদের জেনেটিক কোড।  জীবাণুগুলোর মধ্যে আছে ‘ই কলো’ নামের একটা ব্যাকটেরিয়া, এবং ‘রেসেক্লাও’ পরিবারের বেশ কিছু ভাইরাস। তিন থেকে দশ বছর বয়সের শিশুদের মস্তিস্কে তারা ঢুকে পড়ে, তবে সুপ্ত অবস্থায় থাকে বহু বছর। পূর্ণবয়স্ক মানুষ যারা মচোভিতে পরিণত হয়েছে, তাদের সংস্পর্শ থেকে জীবাণুগুলো ছড়ায়। মচোভিরা বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে, যেমন বইয়ের মধ্যে জীবাণুগুলো ঢুকিয়ে দেয়, বা দূর নিয়ন্ত্রিত চৌম্বকীয় তরঙ্গের মাধ্যমে বাতাসে ভেসে বেড়ানো জীবাণুদের সক্রিয় করে ধূলাবালির সাথে শিশুদের শরীরে প্রবেশ করায়। …আমার হাতে সময় কম, কিন্তু যে কারণে তোমাকে লেখা, সেটা হল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাতেও সম্প্রতি মচোভিদের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। তারা কয়েকটা দুর্গের দখল নিয়ে ফেলেছে। দেশের অন্যান্য প্রান্তে এবং পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায়ও এটা হচ্ছে। কিন্তু মচোভিদের এই সম্প্রসারণ যেভাবে হোক ঠেকাতে হবে। খুশির খবর হল, পাহাড়ি এলাকায় সহজলভ্য কিছু গাছের শেকড়ের রস থেকে বানানো একটা ঔষধ আবিস্কার করা হয়েছে, যা নিয়মিত সেবন করলে শিশুদের মস্তিষ্ক থেকে মচোভিবাহী ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসগুলো সম্পূর্ণ দূর করা যায়। তবে চ্যালেঞ্জ হল, এক নাগাড়ে বেশ কয়েকবছর নিয়মিত সেবন করাতে হবে এই ঔষধ। তা করার জন্য আমাদের দরকার অনেক স্বেচ্ছাসেবী, যারা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে শিক্ষকের ভূমিকায় কাজ করবে। মচোভিদের নজরদারি এড়িয়ে এটা করতে হবে, কারণ তারা অনেক জায়গাতেই মচোভি হয়ে যাওয়া মানুষদেরই স্কুলের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। একটা জিনিস মনে রেখো, বাইরের চেহারা দেখে মচোভিদের চেনা যায় না। বাইরের পরিচয়ে তারা পাহাড়ি, বাঙালি, চাকমা, বড়ুয়া, মুসলমান, খ্রিস্টান যে কোন কিছু হতে পারে, কিন্তু তারা মানুষ না মচোভি, তা বুঝতে হলে তাদের চোখের দিকে ভাল করে তাকিয়ে দেখতে হবে। যাহোক, আরেকটা কথা, শিশুদেরকে প্রতিষেধক ওষুধ খাওয়ানোর পাশাপাশি একটা মন্ত্র পড়াতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে গভীর বিশ্বাসের সাথে, মনপ্রাণ দিয়ে, প্রতিদিন ওষুধ খাওয়ার সময় মন্ত্রটা উচ্চারণ করতে। মন্ত্র উচ্চারণের সময় যে শিশুদের চোখে আলোর ঝিলিক দেখবে, বুঝে নেবে তাদের মধ্যে মচোভির জীবাণু তেমন ছড়িয়ে পড়েনি। আর ভাল কথা, সকল শিশুকেই আমাদের সারিয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। কে পাহাড়ি, কে বাঙালি, কে আদিবাসী, কে আদি-আদিবাসী – এসব বাছবিচার করে একদমই সময় নষ্ট করা যাবে না। যাহোক, এবার মন্ত্রটা মনোযোগ দিয়ে পড়, যাতে ভুলে না যাও। পড়: “আমি লেখাকে ভালবাসি”…।

শেষ চিঠি, আগামীর পাসওয়ার্ড

…এই পর্যায়ে আমি সত্যিই জেগে উঠি। আমি বুঝতে পারি, এতক্ষণ আসলে স্বপ্নের মধ্যে স্বপ্ন দেখছিলাম আমি। খুশী হলাম সেটা বুঝতে পেরে।  “আমি লেখাকে ভালবাসি” – কথাগুলো পড়ার সময় আমি স্বপ্নের মধ্যেই চিৎকার করে উঠেছিলাম, কারণ লেখাকে অন্য কেউ চাইবে, লেখা অন্য কারো হবে, আমার মন সেটা মানতে পারছিল না। বড়পারা গ্রামে যে বাসায় আমি উঠেছি, সেখানে আমার সোলার পাওয়ারে চলা ল্যাপটপ খুলে লেখার ছবি দেখে নিলাম একবার। লেখার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল রাঙামাটিতে, টিচার্স ট্রেনিং কলেজে। ও সাজেকের মেয়ে। অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশুনা শেষ করে ঠিক করেছে, নিজের এলাকায় প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হবে। আমার একসময় পরিকল্পনা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হব, সেভাবেই পড়াশুনা করছিলাম খুলনায়, কিন্তু মাঝখানে অনেক কিছু ঘটে যায়…একসময় আমি ঠিক করি আমি বড়পারা গ্রামে শিক্ষকতা করব। সে সূত্রেই টিচার্স ট্রেনিং কলেজে যাওয়া প্রশিক্ষণের জন্য, যেখানে আমার দেখা লেখার সাথে।  প্রথম দেখাতে প্রেম যাকে বলে…কিন্তু আমরা ঠিক করেছি, বিয়ে এখন আমরা করব না। যে ব্রত নিয়ে আমরা শিক্ষকতা শুরু করেছি, সাজেকের হাচুক কামি এবং খাগড়াছড়ি সদরের বড়পারায় শিক্ষার আলো জ্বালানো – তা চালিয়ে যাব আপাতত। আমরা একে অপরের কাছে চিঠি লিখি নিয়মিত। হাতে লেখা পুরানো রীতির চিঠি। আমি আজকে আসা চিঠি খুলে পড়তে শুরু করলাম, পড়তে গিয়ে চমকে উঠলাম আবার! লেখা লিখেছে:

নখা,

তোমার কাছে এটা আমার শেষ চিঠি। কিছু শব্দ বলে দিয়ে যাচ্ছি, সেগুলো কাজ করবে আগামীতে যাওয়ার চাবি, পোর্টালের পাসওয়ার্ড হিসাবে। প্রথম চাবি কি জান? ককবরকে ‘লেখা’ শব্দের অর্থ কি, ভেবে নাও, তারপর  পোর্টালে যখন যে ভাষায় প্রশ্ন ভেসে উঠবে, সে ভাষায় শব্দটা উচ্চারণ করবে (যদি ‘লেখা’ শব্দের অর্থ ভুলে গিয়ে থাক, সেটা নীচে লেখা আছে, দেখে নিও*)।  আর যে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস পরিবারের নাম বলেছি, সেগুলো দিয়েও বানানো হয়েছে পাসওয়ার্ড, যেগুলো মনে রাখতে হবে। ভবিষ্যতের কিছু অস্ত্র চালনায় এগুলোর দরকার হবে।  ‘ই কলো’কে মনে রাখবে ইউরোপিয়ান কলোনিয়ালিজম হিসাবে। আর ‘রেসেক্লাও’কে মনে রাখবে ‘রেসিজম, সেক্সিজম, ক্লাস ডমিনেশন ও আদার ডিজিজেস’ হিসাবে। আর যেসব গাছের শেকড় নিয়মিত সেবনের কথা বলছিলাম, সেগুলির কিছু নমুনা রাখা আছে রেমাক্রি ও সাজেকের কিছু গ্রামে, খুঁজে নেবে, গাছগুলোর গায়ে লেখা আছে কিছু শব্দ – সমতা, মানবতা, সহভাগিতা (সমাস) ও প্রকৃতির জন্য ভালবাসা (প্রভা)। সমাস আর প্রভা, এই দুইটি শব্দ মনে গেঁথে নাও, যাতে সংকেতগুলো ভুলে না যাও। এবার আমার শেখানো পুরো মন্ত্রটাও মনে গেঁথে নাও ভাল করে: “আমি লেখাকে ভালবাসি। আমি ভালবাসি স্বপ্ন দেখতে। আমি লেখাকে চাই। আমি স্বপ্নের কাছে যেতে চাই। আমি মানুষ হতে চাই।” মন্ত্রটা যেন কোনভাবেই ভুলে না যাও। এগুলো যে শিশুরা গভীর আস্থায় উচ্চারণ করবে, তারা আগামীর পোর্টাল পার হতে পারবে। কথাগুলো অবশ্যই  টুকে রেখো, মনের খাতায়। দেখা হবে লিমাতে, ২০৬২ সালে।

*লেখা = শিক্ষা

(গল্পটি ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরামের ত্রৈমাসিক প্রকাশনা Yakhlwi-এর জন্য আমার আট পর্বের ধারাবাহিক লেখার ২য় কিস্তির অংশ। এই কিস্তিটা হওয়ার কথা ছিল শিক্ষা বিষয়ক একটা নিবন্ধ। তবে  লিখতে বসে নিবন্ধের বদলে একটা গল্পই লিখে ফেলি। কারণটা ব্যাখ্যা করা আছে গল্পসমেত Yakhlwi-এ যে লেখা দিয়েছি, তাতে। আদিবাসী দিবস ২০১৩ উপলক্ষে প্রকাশিতব্য Yakhlwi-এর ২য় সংখ্যায় পুরো লেখাটি বেরুনোর কথা রয়েছে।)Image

Posted in My fiction (Bangla) | 2 Comments

Welcome to my blog

Dear reader,

I created this blog in order to share my reflections on topics that are of interest to me, and hopefully to you too – revolving around questions of identity, our histories, our dreams and despairs, our experiences of life’s journeys so far.

My posts will be a mix of old as well as recent writings, including articles and poems written  in English, Bangla and in some cases Kokborok (or Tripura, my first language).  Your comments and suggestions would be greatly welcome.

PT

Posted in General posts | Leave a comment