বাংলাদেশিদের মধ্যেকার বিবিধ পরিচয়ের শিকড়

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

(বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমান এবং অন্যান্য পরিচয়ের উৎস নিয়ে কিছু ভাবনা)[1]

আমাদের চারপাশে অনেকের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা আছে যে তারা জাতিগত বিভাজন বা সংঘাতকে তথাকথিত বংশগতি বা ‘রেস’ (race)-এর নিরিখে ব্যাখ্যা করতে চায়, যার মূল ভিত্তি আসলে ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক বিভাজন। দক্ষিণ এশিয়ার (Southasian[2]) অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই এটি সত্য। প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আমাদের যেমনই ভাবতে শেখাক না কেন, আধুনিক নৃবিজ্ঞান আমাদের বলে যে, বিশাল বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মানুষ জৈবিকভাবে এক এবং অভিন্ন প্রজাতি। এমনকি সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা বা প্রবণতার দিক থেকেও তারা এক। এই ধারণাটিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর জার্মান নৃবিজ্ঞানী অ্যাডলফ বাস্টিয়ান ‘মানবজাতির মানসিক ঐক্য’ (Psychic Unity of Mankind) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে বুঝতে কতটুকু সাহায্য করে, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পার্থক্যের কারণে তাদের সাধারণ মানবিক পরিচয় দেখতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে?

আমার নিবন্ধ Becoming Bangladeshi মূলত বাঙালি মুসলমান সমাজের দুটি প্রধান সংঘাতের উপর আলোকপাত করে। প্রথমত, বাঙালি মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরে দুটি পরিচয়ের মধ্যে একটি অমীমাংসিত টানাপড়েন রয়েছে: ‘বাঙালি’ বনাম ‘মুসলমান’। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ আমল থেকে বাঙালি মুসলমান জনসংখ্যার ভৌগোলিক বিস্তারের ফলে বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত অ-বাঙালি গোষ্ঠীগুলির সাথে বিভিন্ন সংঘাত তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক উত্থান পর্যালোচনা করে আমি সমসাময়িক বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় ও অতীতের যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা করছি।

ছবিটা ‘হিমাল’ পত্রিকায় প্রকাশিত মূল ভাষ্যের সাথে ছিল

বাংলার সীমান্ত

বাংলার ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কাছে সুপরিচিত যে, মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০৪-১২০৫ সালের দিকে তাঁর বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এই অঞ্চলটি পরবর্তীতে ‘বাঙ্গালা’ এবং ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ নামে পরিচিত হয়। জনশ্রুতি আছে যে, বখতিয়ার খলজি মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করেছিলেন। এই তথ্য (বা মিথ) লক্ষণ সেনের অক্ষমতা নিয়ে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী মহলে অনেক ক্ষোভ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জন্ম দিয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রসার বা বাঙালি মুসলমান  কৃষক সমাজের উত্থানের ইতিহাস মোটা দাগে জানা থাকলেও, এই রূপান্তরের পেছনে থাকা জাতিগত ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াগুলো বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ বা সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে খুব কমই স্পষ্ট। এই ক্ষেত্রে রিচার্ড ইটন-এর বই The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760 একটি গুরুত্বপূর্ণ অভাব পূরণ করেছে।

ইটন বাঙালি মুসলমানদের উদ্ভব নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা খণ্ডন করেছেন। যেমন, একটি প্রচলিত মত হলো, বর্ণপ্রথা বা হিন্দু সমাজের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক বাঙালি ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইটন যুক্তি দেখান যে, ইসলাম প্রধানত পূর্ব বঙ্গে শিকড় গেড়েছিল, যেখানে আর্য বা ‘সংস্কৃতায়িত’ সামাজিক কাঠামো অন্য অঞ্চলের মতো গভীরভাবে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ, পূর্ব বঙ্গের মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে অবধারিতভাবে ‘হিন্দু’ বা ‘বৌদ্ধ’ ছিল না। বরং অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী যারা অনার্য সংস্কৃতির অধিকারী ছিল, তারা বিশেষ কোনো ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ প্রভাব ছাড়াই ইসলামের সংস্পর্শে এসেছিল। এখানে ইটন যে ইসলামের কথা বলেছেন, তা তলোয়ার বা বাণিজ্যের মাধ্যমে আসেনি; বরং এসেছে ক্যারিশম্যাটিক সুফি পীর ও আউলিয়াদের মাধ্যমে, যাঁরা আজও বাংলাদেশের অসংখ্য মাজার বা দরগায় আধ্যাত্মিকভাবে জীবন্ত হয়ে আছেন।

আদিবাসী কে?

তুর্কি বা মোগল শাসনের সময় পূর্ব বঙ্গে কোন আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বাস করত? এই আলোচনার আগে বলে রাখা ভালো যে, সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারি মহলে ‘আদিবাসী’ (indigenous) শব্দটি এক প্রকার ত্যাজ্য হয়ে উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র প্রতি আচরণের জন্য, যারা এখন জাতিসংঘের পরিভাষা অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিত হতে চায়। অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এড়াতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই।

এমনকি কোনো কোনো সরকারি মুখপাত্র এমনও বলেছেন যে, যারা আদিবাসী দাবি করছে তারা আসলে ‘যাযাবর’ বা ‘সাম্প্রতিক অভিবাসী’ এবং বাঙালিরাই হলো এদেশের প্রকৃত আদিবাসী। গত দুই দশক ধরে বেসামরিক ও সামরিক আমলারা এই অবস্থান নিয়ে চলছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই অবস্থান অনেক মর্যাদা-সচেতন বাঙালির আত্মপরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক, যারা মনে করেন তাদের পূর্বপুরুষরা বাইরে থেকে এসেছেন। উদাহরণস্বরূপ, বাঙালি ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যারা নিজেদের আর্য বংশোদ্ভূত মনে করেন, তারা প্রকারান্তরে অ-আদিবাসী বংশ পরিচয়ই দাবি করছেন। একইভাবে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যারা নিজেদের শেখ, সৈয়দ, মোগল বা পাঠান দাবি করেন, তারাও কিন্তু দাবি করছেন যে তাদের পূর্বপুরুষরা বাংলার বাইরে থেকে এসেছেন।

ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার ইতিহাসে আর্য প্রভাব থাকলেও এর কাঠামো ও শব্দভাণ্ডারে মুণ্ডা ও সাঁওতালি ভাষার মতো অনার্য অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার গভীর প্রভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভোট-বর্মি ভাষা পরিবারের (যেমন, কোচ, গারো, ককবরক, মৈতৈ, মারমা ইত্যাদি) প্রভাবও অনস্বীকার্য। অর্থাৎ, আজকের বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয় গঠনে অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং ভোট-বর্মি ভাষী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর বিশাল অবদান রয়েছে।

বিদেশি উৎসের সন্ধান

সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত রূপান্তরের মাধ্যমে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী যে বাঙালি হয়ে উঠেছে, তার বেশ কিছু প্রমাণ আছে। যেমন, রায়, রাজবংশী বা বর্মন উপাধিধারী অনেক মানুষ যারা এখন বাংলা বলেন এবং নিজেদের ‘ক্ষত্রিয়’ হিন্দু দাবি করেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও এথনোগ্রাফিক তথ্য অনুযায়ী তারা মূলত কোচ বা বোড়ো (Bodo) বংশোদ্ভূত। কিন্তু আজ খুব কম মানুষই তা স্বীকার করবেন। এমনকি অনেক বাঙালি মুসলমান পরিবারও ‘শেখ’, ‘সৈয়দ’ বা ‘খান’ উপাধি গ্রহণের পর তাদের আদি শিকড় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে চান না।

উদাহরণস্বরূপ ‘খান’ উপাধিটির কথা ধরা যাক। এটি একটি মঙ্গোল শব্দ যা তুর্কি ভাষায়ও প্রচলিত। মোগল সম্রাটরা এটি অনুসারীদের উপাধি হিসেবে দিতেন। আমার এক সহকর্মী গর্ব করে বলতেন তাঁর পূর্বপুরুষ আফগানিস্তান থেকে এসেছেন। তাঁর শ্যামলা গায়ের রঙ দেখে অন্য এক সহকর্মী একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘ভায়া তামিলনাড়ু’, অর্থাৎ তিনি দক্ষিণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত হতে পারেন!

উপরে উল্লিখিত  ঘটনাটি রেস (race) এবং ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ক বিভ্রান্তিকে তুলে ধরে। আধুনিক নৃবিজ্ঞান ‘রেস’ বা বর্ণবাদী ধারণাগুলোকে বাতিল করে দিয়েছে। একই ভাষায় কথা বলা মানুষের বংশগতি ভিন্ন হতে পারে, আবার একই বংশের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে।

অসহিষ্ণু জাতিরাষ্ট্র

দুর্ভাগ্যবশত, মানুষের বৈচিত্র্য সম্পর্কে বর্ণবাদী ধারণাগুলো এখনও বিশ্বজুড়ে টিকে আছে। কারণ আমাদের পাঠ্যবই, গণমাধ্যম, শিল্প ও সাহিত্যে এই ভুল ধারণাগুলোই বারবার প্রচার করা হয়।

ইন্টারনেটের যুগে জাতীয়তাবাদ (Nationalism) – যা মূলত বিকশিত হয়েছিল ‘মুদ্রণ পুঁজিবাদ’-এর প্রসারের সময়কালে[3] – কতটুকু প্রাসঙ্গিক?  আমরা কি যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের  বিবিধি পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি না? এই প্রশ্নগুলো আজ বাঙালি, আদিবাসী বা বিবিধ পরিচয়ের অন্য সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো যখন তার নাগরিকদের বিবিধ পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন এই ভাবনাগুলো আরও জরুরি হয়ে ওঠে।

টীকা


[1] এই লেখাটি আমার ব্যক্তিগত ইংরেজি ব্লগ Neolithic Musings-এ প্রকাশিত “The Roots of Bangladeshi Identities” নামক পোস্টের অনুবাদ (যে কাজে এআই ‘জেমিনি’র সহায়তা নেওয়া হয়েছে, যদিও এআই-কৃত অনুবাদ লেখকের নিজের সম্পাদনার ভিত্তিতে কিছুটা পরিশীলিত করা হয়েছে)। উল্লিখিত ইংরেজি ব্লগ পোস্টটি  হল ১১ অক্টোবর ২০১২-এ Himal Southasian-এ প্রকাশিত ‘Becoming Bangladeshi’ নামক একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ। উল্লেখ্য যে, হিমাল-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটি মূলত আমার জমা দেওয়া আরও দীর্ঘ একটি লেখা থেকে তৈরি হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল: ‘Two Weddings, a Funeral, and Riots in Assam: Musings on Genes, Memes and the Psychic Unity of Humanity’। পরিমার্জন প্রক্রিয়ায় আমার মূল লেখার যে অংশগুলো বাদ পড়েছিল, সেগুলির ভিত্তিতে সাজানো আমার একটি লেখার লিংক এখানে দেওয়া হল: Random Musings on Identity

[2] আমার মূল ইংরেজি লেখায় ‘দক্ষিণ এশিয়া’-র বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত শব্দটি ‘Southasian’ (South Asian নয়!)   যারা Himal Southasian-এর সাথে পরিচিত, তারা হয়তো জানেন যে এই পত্রিকাটি ভৌগোলিক বিভাগ হিসেবে ‘South Asia’ (দক্ষিণ এশিয়া) শব্দটিকে একটি একক শব্দ (Southasia) হিসেবে ব্যবহার করে। এই ব্যবহারের ব্যাখ্যা তাদের ওয়েবসাইটের এখানে দেওয়া হয়েছে।

[3] ‘প্রিন্ট ক্যাপিটালিজম’ (Print capitalism) বা ‘মুদ্রণ পুঁজিবাদ’ ধারণাটি এখানে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তাঁর ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটিস’ (Imagined Communities) গ্রন্থে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।

ভূমিকম্পের নৃবিজ্ঞান

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

ভূমিকম্পের ঝাঁকুনি টের পাওয়ার পর অনেকের মত আমিও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছি বিভিন্ন সময়ে। নিজের এসব পোস্টে অনেক সময়ই সামনে চলে এসেছে আমার আগ্রহের কেন্দ্রে থাকা কিছু ভাষাবৈজ্ঞানিক বা নৃবৈজ্ঞানিক কৌতূহল। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নিজের কয়েকটি ফেসবুক পোস্টে উঠে আসা আলাপকে একত্র করে সাজিয়েছি এই লেখাটি। কথাটা শুরুতেই বলে দিলাম যাতে ‘ভূমিকম্পের নৃবিজ্ঞান’ শিরোনাম দেখে কোনো পাঠক ধরে না নেন যে এটি সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটা নৈর্ব্যক্তিক ও প্রণালীবদ্ধ নিবন্ধ। তেমন কোনো লেখা কেমন হতে পারে, তার একটা সংক্ষিপ্ত নমুনা আমি প্রথম টীকায় পেশ করেছি, যা মূলত গুগল থেকে নেওয়া হয়েছে ‘এআই’-এর সহায়তায়।[1] তবে নিচে নিজের ফেসবুক টাইমলাইন থেকে তুলে আনা যেসব কথা এক সূত্রে গাঁথা হয়েছে, সেগুলি কোন অর্থে ‘ভূমিকম্পের নৃবিজ্ঞান’ শিরোনামের আওতায় পরিবেশিত হতে পারে, তা আশা করি আলাদা করে ব্যাখ্যা করা লাগবে না।   

ভূমিকম্প আর ভাসুর কেন এক কাতারে  

বলা হয়ে থাকে, ভাসুরের নাম মুখে নিতে নেই। কেন, তা নিয়ে ভেবে দেখলেই বোঝা যায় এর পেছনে রয়েছে পরিবার কাঠামো তথা ক্ষমতা সম্পর্ক, নির্দিষ্ট করে বললে পিতৃতান্ত্রিক পরিসরে বৈবাহিক সূত্রে অধস্তন ভূমিকায় থাকা নারীর মনে কাজ করা ভীতি তথা এই প্রেক্ষিতে অনুসৃত একটা বিশেষ ভাষিক-সাংস্কৃতিক চর্চা। একই চর্চা দেখা যায় বনাঞ্চলের অধিবাসীদের অনেকের মধ্যে, যারা বাঘ বা হাতির মত প্রাণীদের নাম সরাসরি নেয় না। কাজেই, ২০১৬ সালের ৪ঠা জানুয়ারির একটা ভূমিকম্পের ঘটনার পর যখন পঞ্চগড়ে বড় হওয়া একজনের কাছে আমি জানতে পারি, স্থানীয় ভাষায় ‘ভূমিকম্প’ অর্থে ব্যবহৃত শব্দ  (‘মৈশাল’) মুখে উচ্চারণ করা যায় না, এমন সংস্কার নাকি প্রচলিতে ছিল তাদের পরিবারে, আমি অবাক হইনি।

ভূমিকম্প ও সামাজিক বন্ধন/ফাটল[2]

২১ নভেম্বর ২০২৫ সকাল ১০.৩৮ টায় একটা ভূমিকম্পের ধাক্কা ঢাকায় বসে আমরা অনেকেই বেশ ভালোভাবে টের পেয়েছিলাম। সেই সময় আমি কিছুটা অলস সময় কাটাচ্ছিলাম ফেসবুকে। এই অবস্থায় হঠাৎ যখন বেশ বড় একটা ঝাঁকুনি টের পেলাম, আমি যে ঘরে ছিলাম সেটির দরজার চৌকাঠের নিচে দাঁড়িয়ে বাসায় থাকা অন্যদের ডাক দিলাম তারাও যেন এমন কোনো জায়গায় দাঁড়ায়। … কিছুক্ষণ পর যখন মনে হল, আর কোনো ঝাঁকুনি আসবে না, অনেকের মত আমিও ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখতে বসে গেলাম 😃 আর হোয়াটস্‌এপে সক্রিয় হয়ে ওঠা দু’একটা গ্রুপের চ্যাটে যোগ দিলাম একটুখানি। এরপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম একটু, যখন দেখতে পেলাম, আশেপাশের ভবন থেকে বেরিয়ে আসা অনেক মানুষ – একটা বড় অংশ নারী আর শিশু – আমাদের আবাসিক এলাকার ভেতরের রাস্তায় ভিড় করে আছে, কেউবা দাঁড়িয়ে, অনেকে বসে, আবার বাচ্চারা অনেকে মাঠে ছুটাছুটি করছে। …

বলা বাহুল্য, কয়েক সেকেন্ডের ঝাঁকুনি আমাদের অনেককে হঠাৎ করে একই পরিসরে (ঘরের ভেতরে, রাস্তায় বা ভার্চুয়ালি) টেনে আনার পর আমরা অনেকেই আমাদের জীবনের প্রাত্যহিক ছন্দের বাইরে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে জেগে ওঠা সামাজিক মিথষ্ক্রিয়া, সহমর্মিতা, আলাপচারিতা ইত্যাদিতে মেতে উঠেছিলাম।

তবে যে কোনো বিপদের সময় সমাজের বহু মানুষের একে অপরের কাছে ছুটে যাওয়ার, পাশে দাঁড়ানোর প্রবণতার বিপরীতে ভিন্ন আরেকটা ধারাও দেখা যায়, যেখানে সমাজের নানান ফাটল হয়ত আরও বড় হয়ে দেখা দিতে পারে। কথাটা মনে পড়ল বেলা ১টার পর বাসা থেকে বেরিয়ে উত্তরার দিকে যাওয়ার সময় পথে এক জায়গায় মাইকে ভেসে আসা কিছু কথা শোনার পর। শুনলাম, কে যেন ব্যাখ্যা করছেন ‘ভূমিকম্প কেন হয়’। এ ধরনের আলাপ পরে ফেসবুকেও কিছুটা চোখে পড়েছে। এসবের সূত্রে মনে পড়ে গেল ‘জাদু’[3] ও ‘উইচক্রাফট’ বিষয়ক একটা পুরানো নৃবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, সেটা এই যে, যুগে যুগে বিভিন্ন সমাজে যেভাবে অনেককে ‘উইচ’ (ডাইনি/ক্ষতিকর জাদুবিদ্যার চর্চাকারী) হিসাবে চিহ্নিত করা হয়, তার পেছনে এক ধরনের সমাজতত্ত্ব কাজ করে। দেখা যায়, উইচক্রাফট বিষয়ক বিভিন্ন বিশ্বাস ও সামাজিক চর্চার মধ্যে সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন অসমতা ও বৈষম্যগুলোকে টিকিয়ে রাখার, আরও পোক্ত করার চেষ্টা দেখা যায়।

যাদেরকে আমরা দেখতে পারি না, তাদের উপর দোষ চাপিয়ে, বা তাদের বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যের দিকে আঙুল তুলে, আমরা নানা ধরনের বয়ান তৈরি করি, কেন ভূমিকম্পের মত বিপদ হঠাৎ করে ধেয়ে আসল! ইভান্স প্রিচার্ড নামের একজন নৃবিজ্ঞানী বোঝার চেষ্টা করেছিলেন এমন চিন্তার পেছনের যুক্তিগুলিকে। যেমন, আজান্দে নামের একটি জনগোষ্ঠীর একটা গ্রামে দেখা গিয়েছিল, উইয়ে খাওয়া খুঁটি ভেঙে যাওয়াতে যখন ধসে পড়া একটি গোলাঘরের নিচে চাপা পড়ে একজন মানুষ মারা যায়, এর জন্য স্থানীয়রা সবাই দায়ী ‘উইচ’কে খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছিল। যখন ইভান্স-প্রিচার্ড তাদেরকে বললেন, “আপনারা কি কেউই খেয়াল করেননি যে গোলাঘর ধসে পড়ার আসল কারণ হল উইপোকা?”, উত্তর এসেছিল, “সেটাতো আমরা জানি। কিন্তু যে মুহূর্তে গোলাঘর ভেঙে পড়বে, ঠিক তখনই কেন সেখানে লোকটি শুয়ে ছিল (যে মারা যায়)?” এই ‘কার্যকারণ’ হল উইচক্রাফটের ফল!

যদি আমরা আমাদের চোখ থেকে সকল ঔপনিবেশিক বা ‘ওরিয়েন্টালিস্ট’ চশমা সরিয়েও ফেলি, একটা ভাবনা মনে ঘুরপাক খেতেই থাকে, আমাদের চারপাশে যেভাবে বহু মানুষ এক ধরনের জাদু-সুলভ চিন্তাচেতনা দ্বারা তাড়িত, সেখানে ভিন্ন ধরনের যুক্তিতর্ক দৃষ্টিভঙ্গী প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ কতটা আছে? যে কংক্রিটের জঙ্গলে আমরা অনেকেই এক ধরনের ‘পেজ্যান্ট’ সংস্কৃতির আবহে বাস করি, সেখানে কতটুকু সর্বজনীন একটা নতুন ধারার ‘নাগরিক’ বোধ তৈরি করা সম্ভব?    

ভূমিকম্পের ধাক্কায় সামনে আসা ভাষিক বৈচিত্রের মানচিত্র

২০২৩ সালের ২রা ডিসেম্বর তারিখে একটা ভূমিকম্প আমরা অনেকেই টের পেয়েছিলাম বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। সেই প্রেক্ষিতে সেদিনকার একটা ফেসবুক পোস্ট আমি শুরু করেছিলাম একটা প্রশ্ন দিয়ে, “আজ কি আপনারা কেউ চিৎকার করে ‘বাংলা’, ‘বুইসাল’, ‘মইশাল’, ‘ভুজোল’, ‘ভুইকাপ’ বা এমন কোনো শব্দ উচ্চারণ করে উঠেছেন, বা অন্য কাউকে তা করতে শুনেছেন?” একই দিনে, ভূমিকম্পের ককবরক (ত্রিপুরা) প্রতিশব্দ ব্যবহার করে ফেসবুকে আরেকটা পোস্ট দিয়েছিলাম। এ প্রসঙ্গে ২০১৬ সালের একটা ফেসবুক পোস্টের মত করে নতুন করে আবার ফেসবুক বন্ধুদের বলেছিলাম যে, তাঁরা যদি বাস্তবে কোনো ত্রিপুরাকে ‘বাংলা!’ ‘বাংলা!’ চিৎকার করতে করতে ছোটাছুটি করতে দেখেন, এর মধ্যে ভাষাগত বা সাম্প্রদায়িক ভীতি যেন কেউ খুঁজতে না যান, যেহেতু ককবরকে ‘বাংলা’ বলতে বোঝায় ভূমিকম্প (এবং এক্ষেত্রে ভাষার নাম হিসাবে ব্যবহৃত ‘বাংলা’ শব্দের সাথে মিলটা স্রেফ কাকতালীয়)। 😃

উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৪ঠা জানুয়ারি বেশ জোরালো একটা ভূমিকম্প যখন মণিপুরের ইম্ফলসহ আশেপাশের অনেক জায়গায় (বাংলাদেশেও) ঝাঁকুনি দিয়েছিল, সেদিন একটা পোস্ট দিয়েছিলাম ফেসবুক বন্ধুদের কাছে জানতে চেয়ে, ভূমিকম্পকে নিজেদের অঞ্চলে প্রচলিত ‘আঞ্চলিক বাংলা’ বা অন্য কোনো ভাষায় কে কি নামে চেনেন। অবশ্য পোস্টটা দেওয়ার আগেই ঘটনাক্রমে সেদিন আমি জেনে গিয়েছিলাম যে পঞ্চগড়ে অনেকে ভূমিকম্পকে ‘মৈশাল’ বলে। এরপর ফেসবুক বন্ধুদের কাছ থেকে ব্যুৎপত্তিগতভাবে সমতুল্য আরও বেশ কিছু শব্দের হদিস পেয়েছিলাম, যেগুলির কয়েকটি উপরে উল্লেখ করেছি। নিচে এসব শব্দের কোনটি কারা কোথায় ব্যবহার করে, তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হল।

ভূমিকম্পকে সিলেটে নাকি ‘বুইসাল’ বলা হয়, এবং বিষ্ণুপ্রিয়া ভাষায়ও সম্ভবত একই রকমের শব্দ রয়েছে। চাটগাঁইয়ারা কেউবা বলে ভুচাল বা ভুচল, কেউবা ভুজল; চাকমা ভাষায় ‘ভুজল’ বা ‘ভুজোল’; দিনাজপুরে ‘ভুইশাল’; টাঙ্গাইলের কিছু এলাকায় ‘ভুইকাপ’। ভূমিকম্পের ককবরক প্রতিশব্দ ‘বাংলা’র সাথে স্পষ্ট মিল রয়েছে ডিমাছা (এবং সম্ভবত কাছাড়ি) ভাষায় প্রচলিত ‘বাংগ্লা’ এবং বোরো ‘বাংরি’র। এসবের বাইরে খুমি, বম, রাখাইন ইত্যাদি ভাষার যে নমুনাগুলি সেদিন জেনেছিলাম আমার ফেসবুক বন্ধুদের কাছ থেকে, সেগুলি ভিন্ন ধরনের ছিল।[4] তবে এমন বিভিন্ন ভাষায় ভূমিকম্প-বাচক শব্দসমূহের একটা পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা গেলে হয়তবা মইশাল/বুইসাল/ভুচল/ভুজোল বা বাংলা/বাংগ্রি/বাংরি-র মত ব্যুৎপত্তিগত সমগোত্রীয় আরও কিছু ‘ক্লাস্টার’ শনাক্ত করা যাবে। এ ধরনের বিষয়ে যাঁরা ঘাঁটাঘাঁটি করতে আগ্রহী, তাঁরা আরও ভালো করে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন।

টীকা


[1] ভূমিকম্পের নৃবিজ্ঞান (Anthropology of Earthquakes) বলতে বোঝায় ভূমিকম্পের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষের আচরণ, সাংস্কৃতিক বিশ্বাস এবং সামাজিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা। এটি একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যা প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নিছক ভূতাত্ত্বিক ঘটনা হিসেবে না দেখে মানুষের অভিজ্ঞতা ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করে।

এই গবেষণার প্রধান বিষয়গুলো হলো:

  • সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস: বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ভূমিকম্পকে কীভাবে দেখা হয়? অনেক ঐতিহ্যবাহী সমাজে একে দেবতাদের ক্রোধ বা অশুভ শক্তির কাজ বলে মনে করা হয়, যা মানুষের আচরণ এবং দুর্যোগের পরবর্তী কর্মকাণ্ডকে প্রভাবিত করে।
  • সামাজিক কাঠামোতে প্রভাব: ভূমিকম্পের মতো বড় দুর্যোগ একটি সমাজের বিদ্যমান কাঠামো, যেমন—পরিবার, সম্প্রদায় এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে কীভাবে প্রভাবিত করে বা পরিবর্তন করে দেয়, তা নৃবিজ্ঞানীরা খতিয়ে দেখেন।
  • স্মৃতি ও প্রজন্ম: একটি দুর্যোগের স্মৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে কীভাবে বাহিত হয় এবং তা ওই সম্প্রদায়ের সম্মিলিত চেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির ওপর কী প্রভাব ফেলে, তা এই গবেষণার অন্তর্ভুক্ত।
  • পুনর্গঠন ও স্থিতিস্থাপকতা (Resilience): দুর্যোগের পর একটি সমাজ কীভাবে নিজেদের গুছিয়ে তোলে (পুনর্গঠন প্রক্রিয়া), এবং এই পুনরুদ্ধারের কাজে স্থানীয় জ্ঞান ও প্রথাগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করে, তাও নৃবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়।

সহজ কথায়, ভূমিকম্পের নৃবিজ্ঞান মূলত প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে মানুষের মানবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দিকগুলো বোঝার চেষ্টা করে।

[2] লেখার এই অংশটি এসেছে  ২১ নভেম্বর ২০২৫ লেখা ‘ভূমিকম্পের উপর একটা নৃবৈজ্ঞানিক নোট’ শীর্ষক একটি ফেসবুক নোট থেকে।

[3] ‘জাদু’ ধারণাটি নৃবিজ্ঞানে যে অর্থে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ক আমার নিজের একটি লেখা রয়েছে এই ব্লগে, যা পাঠক চাইলে দেখে  নিতে পারেন:  জাদু, ধর্ম ও বিজ্ঞান

[4] আগ্রহী পাঠক চাইলে নমুনাগুলি দেখে নিতে পারেন আমার  ৪ জানুয়ারি ২০১৬-এর ফেসবুক পোস্ট-এর মন্তব্যের ঘরে।

আমার ফেসবুক জীবন

Being and Timeline

(ফেসবুকে কাটানো আমার প্রথম পাঁচ বছরের বৃত্তান্ত ও সাম্প্রতিক একটি আপডেট)[*]

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

ফেসবুক কবে এবং কিভাবে আমাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের এত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠল? ২০১৩ সালের নভেম্বরে আমার ফেসবুক জীবনের পাঁচ বছর পূর্তির প্রাক্কালে আমি নিজেকে এই প্রশ্নটি করি। এই প্রেক্ষিতে তখন একটি ফেসবুক নোট লিখেছিলাম, ইংরেজিতে, যেখানে উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর একটু হালকা মেজাজেই উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বোঝা যাবে সেই নোটের শুরুতে ব্যবহৃত একটি উদ্ধৃতি থেকে, যেখানে জার্মান দার্শনিক হাইডেগারের একটি বক্তব্যে ব্যবহৃত ‘পড়ো’ [read] শব্দের জায়গায় ‘ফেসবুক ব্যবহার করো’ [Facebook] কথাটি বসানো হয়েছে:

‘আমাকে বলো তুমি কিভাবে [ফেসবুক ব্যবহার করো], আর আমি তোমাকে বলবো তুমি কে।’ – মার্টিন হাইডেগার

২০০৮: চারজন ফেসবুক বন্ধু নিয়ে নীরব যাত্রা

আমি ফেসবুকে যোগ দেই ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর তারিখে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব ধীরগতিতে ও নীরবে। ২০০৮ সালের শেষে, আমার মাত্র চারজন ফেসবুক বন্ধু ছিল: যাদের দুজন ছিল কানাডায় অভিবাসিত আমার দুই ভাইপো, এবং একজন ছিল দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা আমার গ্র্যাজুয়েট স্কুলের (বার্কলে) এক বন্ধু, যাকে আমি ফেসবুকে খুঁজে পেয়েছিলাম। এই বন্ধুদের যোগ করা ছাড়া সেই সময়ে আমার আর কোনো ফেসবুক কার্যকলাপের রেকর্ড নেই। আসলে, আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি পরবর্তী তিন বছর ধরে অনেকটাই অব্যবহৃত অবস্থাতেই পড়ে ছিল।

২০০৯: দুটি স্ট্যাটাস, একটি জন্মদিনের শুভেচ্ছা, এবং স্ত্রীকে বন্ধু বানানো

আমি ২০০৯ সালের ১৫ এপ্রিল আমার প্রথম ফেসবুক স্ট্যাটাস পোস্ট করি। এটি ছিল অফিসের কাজে রাঙ্গামাটিতে সম্পন্ন করা একটি সফর নিয়ে,  যখন আমি বৈ-সা-বি (পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী চৈত্রসংক্রান্তি ও নববর্ষের উৎসব) উপলক্ষে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেছিলাম এবং বিশেষ সুস্বাদু খাবার ও পানীয় উপভোগ করেছিলাম, যা আমার ‘অফিসিয়াল’ কর্তব্যের অংশ ছিল। পোস্টটিতে তখন কোনো ‘লাইক’ পড়েনি, তবে একটি মন্তব্য এসেছিল, যা ছিল দক্ষিণ কোরিয়ায় স্বজনদের থেকে দূরে বসবাসকারী  আমার এর দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের কাছ থেকে। আমার পরের স্ট্যাটাসটি, যা জুনে ব্যাংককে আরেকটি দাপ্তরিক সফরের সময় পোস্ট করা হয়েছিল, তা ছিল এরকম: “আমার হোটেলের জানালা দিয়ে তাকিয়ে একটি সুন্দর রংধনুর চমৎকার দৃশ্য দেখলাম… [ঢাকায়] শেষ কবে এমন কিছু দেখেছিলাম মনে করতে পারছি না।” এই পোস্টটিও কোনো ‘লাইক’ পায়নি, তবে কয়েকটি মন্তব্যের জন্ম দিয়েছিল [আমার দু’একজন বন্ধু বলেছিল, ঢাকায়ও রংধনু দেখা যায়]।

এই বছরই আমি ফেসবুকে আমার প্রথম জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাই। আমার এক ভাইপো আমার ‘ওয়াল’-এ বার্তা হিসেবে এটি রেখেছিল, যা ছিল সে বছরের একমাত্র ফেসবুক-কেন্দ্রিক জন্মদিনের শুভেচ্ছা। এই বছরই আমি আমার ‘ইনবক্স’-এ প্রথম ফেসবুক বার্তাও পাই: একজন সদ্য ফেসবুক বন্ধু হওয়া ব্যক্তির কাছ থেকে একটি ধন্যবাদ বার্তা।

২০০৯ সালে, আমি মোট ১৩০ জন নতুন ফেসবুক বন্ধু যোগ করি। তাদের মধ্যে ছিল আইনুন, মানে আমার স্ত্রী, যার সাথে আমাদের বিয়ের প্রায় দেড় দশক পরে আমি ‘বন্ধু’ হই [এই নতুন মাধ্যমে]! (প্রসঙ্গত, আইনুনই ছিল আমার প্রথম ফেসবুক প্রশিক্ষক, যে এই মাধ্যমের কিছু দিক কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সে সম্পর্কে আমাকে কিছু টিপস দিয়েছিল।)

২০১০: পোস্টবিহীন একটি বছর, একমুখী ট্যাগিং এবং অব্যবহৃত ইনবক্স

এই বছর বন্ধুত্বের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টগুলি সামলানো ছাড়া (৫০০-এরও বেশি নতুন ফেসবুক বন্ধু যোগ করেছিলাম পুরো বছরে) ফেসবুকে আমার আর কোনো কার্যকলাপ ছিল না। আমি নিজের কোনো স্ট্যাটাস আপডেট বা ছবি পোস্ট করিনি। তবে, আমি অন্যদের পোস্টে তাদের দ্বারা ‘ট্যক্ত’ (অর্থাৎ  ‘ট্যাগিত’) হতে শুরু করি।

জুনে আমার এক কাজিনের নাতনি – যে ততদিনে আমার ফেসবুক বন্ধুও হয়েছিল – আমাকে প্রথমবার তার একটি ফেসবুক নোটে ট্যাগ করে। আমার চেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ আরেকজন ফেসবুক বন্ধুও একইভাবে আমাকে ট্যাগ করা শুরু করেন। যদিও আমি তখনো এ ধরনের লেখা পড়তে অভ্যস্ত ছিলাম না, এবং আমার নিজের ফেসবুক নোট পোস্ট করার অভ্যাস শুরু হতে তখনও প্রায় দুই বছর বাকি ছিল। (পরে যখন আমি নিজের নোট পোস্ট করা শুরু করি, তখন এই দুজন ফেসবুক বন্ধুর কেউই আগের মতো সক্রিয় বলে মনে হয়নি। আমি ভাবি এটি কি কেবল একটি কাকতালীয় ঘটনা ছিল, নাকি এটি একটি সাধারণ প্রবণতার অংশ, যেমন শিশুরা স্বাভাবিক গতিতে হাঁটা শিখার আগেই দৌড়াতে শুরু করে?)

২০১০ সালের জুলাই মাসে, আমাকে দুটি ছবিতে ট্যাগ করা হয়েছিল: একটি ছিল প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাথে আমার ছবি; অন্যটি ছিল আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে একটি রাস্তার বিক্ষোভের ছবি। পরের মাসে, আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল-সম্পর্কিত একটি সংকলন বিষয়ক একটি নোটে ট্যাগ করা হয়েছিল, যেখানে আমারও কয়েকটি প্রবন্ধ ছিল। এই ট্যাগগুলির জবাবে আমি কোনো ‘লাইক’ বা মন্তব্য করিনি। একইভাবে, অক্টোবরে, আমি একটি পূজার শুভেচ্ছা কার্ডে ট্যাগ-কৃত হওয়া সত্ত্বেও সেটির স্বীকৃতি জানাইনি। আমি এই সময়ের বেশ কিছু না-পড়া বার্তাও অনেক পরে আবিষ্কার করি। আমি হয় ফেসবুকে খুব অনিয়মিত ছিলাম, বা ফেসবুকের শিষ্টাচার সম্পর্কে তখনও অজ্ঞ ছিলাম, অথবা দুটোই। সংশ্লিষ্ট সকলের কাছে আমার বিলম্বিত ক্ষমা প্রার্থনা!

২০১১: ফেসবুকে নীরব উপস্থিতির আরেকটি বছর শেষ হলো ‘স্মৃতির পথে যাত্রা’ দিয়ে

আমার ফেসবুক উপস্থিতির তৃতীয় বছরটিও আমার পক্ষ থেকে প্রায় কোনো কার্যকলাপ ছাড়াই অনেকটা নীরবে কেটে যায়, প্রায় ৫০০ নতুন ফেসবুক বন্ধু যোগ করা ছাড়া। তবে, পেশাগতভাবে, আমি একটি খুব ব্যস্ত বছর কাটিয়েছিলাম যখন আমাকে টানা বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের সাথে মোকাবিলা করতে হয়েছিল, যার মধ্যে একটি ছিল বড় একটি পাবলিক ইভেন্টের নেপথ্য ব্যবস্থাপনা, যে অনুষ্ঠানকে ঘিরে যথেষ্ট অগ্রিম বিরোধিতা সামনে আসতে থাকে, যার বড় অংশ ছিল প্রকাশিত হতে শুরু করে ফেসবুকে। তবে, এই মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করার মতো অবস্থানে আমি ছিলাম না। প্রথমত, ফেসবুকে পুরো বিষয়টা ঘেঁটে দেখার দক্ষতা বা সময় আমার ছিল না। দ্বিতীয়ত, আমার অফিসে সামাজিক মাধ্যমের সাথে কিভাবে যুক্ত হতে হবে সে সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল না, যদিও একজন বিশেষজ্ঞ একবার আমাদের খারাপ প্রেস সামলানোর বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছিলেন: “প্রতিক্রিয়া দেখাবেন না। প্রতিবাদ বা প্রত্যুত্তর দেওয়ার দিকে যাবেন না। বরং আপনি কী করেন, এবং আপনার উদ্দেশ্য ও অর্জনগুলি কী কী, সেসব সম্পর্কেই কথা বলতে থাকুন।”

যাই হোক, ডিসেম্বর মাসের মাঝামাঝি নাগাদ, কাজের চাপ কমে যাওয়ার পরে, আমি মানসিকভাবেও নিজেকে একটু ভারমুক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ফেসবুকে কিছুটা সক্রিয় হতে শুরু করি। প্রাথমিকভাবে, আমি মূলত ছবি পোস্টের দিকে মনোনিবেশ করি, যার মাধ্যমে আমি ‘লাইক’ এবং মন্তব্য পাওয়া ও দেওয়াতে অভ্যস্ত (বা আসক্ত) হয়ে উঠি। আমার পোস্ট করা প্রথম ফেসবুক ছবিটি – যাতে আমার স্ত্রীর জন্মদিনে আমাকে এবং তাকে দেখা যাচ্ছিল – বেশ সাড়া পেয়েছিল, যেটিতে ১৮৩টি লাইক এবং ৫৬টি মন্তব্য এসেছিল (এগুলির মধ্যে আমার নিজেরও কিছু মন্তব্য ছিল যাতে প্রচুর পরিমাণে ইমোটিকন ব্যবহার করা হয়েছিল)। আমি একটি বিশেষভাবে ডিজাইন করা নববর্ষের কার্ডও পোস্ট করি এবং ‘ডাউন মেমরি লেন’ (Down Memory Lane) শিরোনামে আমার প্রথম ফটো অ্যালবাম যোগ করি, যেখানে পরিবারের সদস্যদের ছবি ছিল।

২০১২: আমার জীবনের একটি বিশেষ মোড়ে ফেসবুক

২০১২ সালে এসে আমার বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হয়। এই বিশেষ উপলক্ষে আমি তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে আমার তৃতীয় ফেসবুক স্ট্যাটাস আপডেটটি পোস্ট করতে অনুপ্রাণিত হই। আমি লিখেছিলাম:

HBD শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো সকল ফেসবুক বন্ধুদের ধন্যবাদ। এটি একটি বিশেষ উপলক্ষ, কারণ আমি যদি ক্রিকেট খেলতাম, তবে একটি বিশেষ মাইলফলকে পৌঁছে ব্যাট উঁচু করে ধরতাম…কিন্তু এই মুহূর্তে আমি কোনো স্টেডিয়ামের মাঝে নেই, এমনকি কাজেও নেই। তার বদলে আমি বাড়িতে চুপচাপ একটি দিন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিছুক্ষণ পর আমি হয়তো জীবনের ‘যা যা করার আছে’ তালিকা সহ আমার বিশেষ নোটবুকটি খুলতে পারি। দুঃখিত, তালিকাটি একান্ত ব্যক্তিগত, ফলে আপনাদের সাথে শেয়ার করা যাবে না, তবে একটি ভাবনা দিয়ে শেষ করি: আমি কখনও ক্রিকেট খেলিনি, তবে সময় পেলে টিভিতে এটি দেখতে পছন্দ করতে শুরু করেছি। টি২০ বা ৫০ ওভারের ম্যাচগুলি অনেক উত্তেজনা দেয়, তবে জীবনটা টেস্ট ম্যাচের মতো। আপনাকে প্রতিটি বল, প্রতিটি ওভারের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে এবং প্রতিটি সেশন দেখেশুনে খেলতে হবে। এই মুহূর্তে আমি কোনো মাইলফলক নিয়ে ভাবছি না, কেবল আমার বাকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দিন উপভোগ করতে চাই। শুভ দিন।

উপরের পোস্টটির পরপরই, আমি ফেসবুকের সেটিং-এ নিজের স্ট্যাটাস ‘বিবাহিত’ দেখাই। কিন্তু এই আপডেটের পরে টাইমলানে যে নোটিফিকেশন এসেছিল তা নানা ধরনের প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় যেগুলিতে আইনুন আর আমি খুবমজা পেয়েছিলাম। যারা আমাদের সেভাবে চিনতেন না, তাদের কেউ কেউ ভেবেছিলেন যে আমাদের বিয়ে সবে হয়েছিল! যাই হোক, সেই সময় আমি একটি পুরনো কবিতার অংশবিশেষও পোস্ট করেছিলাম – যা ছিল আমার এই ধরনের প্রথম পোস্ট – যা স্কুলের বন্ধুদের সাথে কাটানো সময় নিয়ে লেখা ছিল, যাদের কয়েকজনের সাথে আমি মাত্রই একটি জন্মদিনের পার্টিতে মিলিত হয়েছিলাম, যা আমি এবং একজন সহকর্মী (যিনিও ৫০ বছর পূর্ণ করেছিলেন) যৌথভাবে আয়োজন করেছিলাম। আমরা এর নাম দিয়েছিলাম ৫০-৫০ (ফিফটি-ফিফটি) পার্টি!

এদিকে, বিশেষ এক কারণে যা আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই না, আমার ৫০তম জন্মদিনের পরপরই, আমি আমার তখনকার মোটা বেতনের চাকরি থেকে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিই, আমার অফিসে চার মাসের অগ্রিম নোটিশ দিয়ে। পরে, আমার সহকর্মীদের আয়োজিত একটি বিদায়ী অনুষ্ঠানে, আমি আমার সিদ্ধান্তের একটি ব্যাখ্যা ঠাট্টাচ্ছলে দিয়েছিলাম এভাবে: “পঞ্চাশ বছর বয়সে মানুষের নাকি মিড-লাইফ ক্রাইসিস হয়।  হয় জীবনসঙ্গী পরিবর্তন করা লাগে, নতুবা চাকরি। আমি শেষেরটি পাল্টানোর পথ বেছে নিয়েছি, যাতে আমি ফেসবুকে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে পারি!” ততদিনে, আমি সত্যিই ফেসবুকে প্রচুর সময় ব্যয় করা শুরু করেছিলাম, যে মাধ্যম আমার পোস্টগুলির জন্য একটা রেডিমেড অডিয়েন্স জুগিয়েছিল।

এপ্রিলের মাঝামাঝি, বাংলা নববর্ষের শুরুতে, আমি আমার প্রথম ফেসবুক নোট, বাংলায়, পোস্ট করি, যার শিরোনাম ছিল “আমার জীবনের খোলা হালখাতার প্রথম পাতা”। পরে, আমি আরও অনেক ফেসবুক নোট পোস্ট বা ড্রাফ্ট করতে থাকি, যার মধ্যে কিছু শেষ পর্যন্ত সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রবন্ধে পরিণত হয়।

নতুন ফেসবুক বন্ধু তৈরির দিক থেকে ২০১২ সাল ছিল একটি রেকর্ড বছর, যখন মোট ১২০০ নতুন বন্ধু জুটিয়েছিলাম।

২০১৩: অতিক্রান্ত পথ এবং সামনের সম্ভাব্য বাধা মোড়গুলি নিয়ে চিন্তা

বর্তমানে আমার মোট প্রায় তিন হাজার ফেসবুক বন্ধু রয়েছেন। তাদের মধ্যে আমি আগে থেকে চিনি এমন মানুষ যেমন আছেন, তেমনি অনেকে আছেন যাদের সাথে আগে থেকে সাক্ষাত-পরিচয় হয়নি। শেষোক্ত বর্গের মধ্যে, ইতোমধ্যেই কয়েকজনের সাথে বাস টার্মিনাল, বিমানবন্দর বা পার্কের মতো জায়গায় ঘটনাক্রমে আমার দেখা হয়েছে। এমন (ফেসবুকে দেখা) পরিচিত চেহারার কেউ এসে যখন বলে, “হ্যালো, আপনি কি প্রশান্ত দা? আমি অমুক। আমরা ফেসবুক বন্ধু!” তখন তা সাধারণত একটি আনন্দদায়ক চমকের ঘটনা হয়।

আমি জানি যে আমি চাইলে আরও দুই হাজার ফেসবুক বন্ধু যুক্ত করতে পারি। কিন্তু সম্প্রতি আমি কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছি যাদের আমি খুব কমই চিনি, বা যারা তাদের আসল পরিচয় গোপন রেখে রিকোয়েস্ট পাঠায়, তাদের নিয়ে কী করব এ নিয়ে। কিছু দার্শনিক বা সমাজতাত্ত্বিক প্রশ্ন রয়েছে যার কোনো মীমাংসা আমি এখনও করতে পারিনি: ফেসবুক বা ‘বাস্তব’ জীবনে মুখোশের আড়ালে ‘আসল’ মুখ খোঁজা কি সম্ভব বা প্রয়োজনীয়? আমাকে নিজেকেও জিজ্ঞাসা করতে হবে, ফেসবুকে আমি ঠিক কিভাবে নিজেকে উপস্থাপন করতে থাকব? আমি আরও ফেসবুক বন্ধু তৈরি করার দিকে যাব কিনা তা হয়তো এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করতে পারে। তবে, এমন কিছু অনুরোধও থাকতে পারে যা আমি ভালোভাবে চিনি এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে কিন্তু আমি লক্ষ্য করিনি। এই নোটটি যাঁরা পড়ছেন তাঁদের মধ্যে যদি ঘটনাক্রমে এমন কোনো ব্যক্তি থাকেন, তাঁর কাছে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

আজকাল এটাও মনে রাখতে হয় যে ‘ফেসবুক’ নানাভাবে অনেকের জন্য বিপদ ডেকে এনেছে (যেমন, রামু ও সাঁথিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ চালানোর অজুহাত হিসাবে ভুয়া ফেসবুক পোস্ট ব্যবহার করা হয়েছিল)। এছাড়াও নতুন আইনও (সংশোধিত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা) রয়েছে যা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে দমন করার জন্য তৈরি হয়েছে বলে মনে হয় (যেমন একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেবল ফেসবুকে এমন একটি পোস্ট লেখার জন্য গ্রেফতার হয়েছেন যা ক্ষমতাশীলদের কাছে আপত্তিকর বলে মনে হয়েছে)। এই ধরনের ঘটনা একজনের টাইমলাইনে চলে আসতে পারে, এমন সম্ভাব্য বা কল্পিত বিপত্তি ও বাঁক নিয়ে আমাদের চিন্তিত করে তোলে। এটা কি সাবধানে চলার বছর?

সাবধানতাকে একপাশে রেখে, সব মিলিয়ে, আমি আমার ফেসবুক অভিজ্ঞতা এখন পর্যন্ত সত্যিই উপভোগ করেছি। পুরনো বন্ধুদের সাথে পুনরায় মিলিত হওয়া এবং নতুনদের সাথে পরিচিত হওয়া ছাড়াও, ফেসবুক আমাকে এমন ধরনের লেখালেখিতে ফিরে যেতে সাহায্য করেছে যা আমি খুব অর্থবহ মনে করি। এ পর্যন্ত, আমি প্রায় পঁয়তাল্লিশটি ফেসবুক নোট এবং আরও অনেক স্ট্যাটাস পোস্ট করেছি যেগুলি আমি গুনে দেখিনি। সম্প্রতি, আমি ব্লগিং-এর দিকেও ঝুঁকেছি, যে পদক্ষেপ আমি নিয়েছি আংশিকভাবে ফেসবুকে পাওয়া পরামর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে। ফেসবুকের উপর আমি এখনও আমার ব্লগ পোস্টের সম্ভাব্য পাঠকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য নির্ভর করি। আমার এটাও যোগ করা উচিত যে আমার ফেসবুক বন্ধুদের অগণিত পোস্টের মাধ্যমে আমি অনেক কিছু শিখেছি এবং অনেক হেসেছিও।

আমি জানি যে ফেসবুক বা ব্লগিং আমাকে জীবিকা অর্জনে সাহায্য করবে না, তবে এসব মাধ্যম আমাকে বেশ সজীব থাকার অনুভূতি এনে দেয়। এর জন্য, সবচেয়ে বেশি ঋণী আমি আপনাদের কাছে, আমার ফেসবুক বন্ধু (এবং “অনুসারী”) দের কাছে। তাই, প্রিয় বন্ধুরা, ফেসবুকে (এবং এর বাইরেও) আমার বর্তমান অস্তিত্ব ও সময়রেখাকে রূপ দিতে আপনারা যা করেছেন তার জন্য ধন্যবাদ।

আপডেট (জুলাই ২০২৩)

‘অস্তিত্ব ও সময়রেখা’ পোস্ট করার পরে, আমি ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আরও প্রায় ৪৪টি ফেসবুক নোট প্রকাশ করি। তবে, ফেসবুক শীঘ্রই এই ফিচারটি বন্ধ করে দেয়, যা ২০২০ সালের অক্টোবর মাসের মধ্যে ‘কেবল পঠনযোগ্য’ হয়ে ওঠে এবং এবং এক সময় কোনো নোটিশ ছাড়াই সম্পূর্ণভাবে অদৃশ্য হয়ে যায়। লিংক থাকলে এখনও পুরনো ফেসবুক নোট দেখা সম্ভব, তবে সেগুলিকে সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই, আমি আমার অনেক পুরনো ফেসবুক নোট – যার বেশিরভাগই বাংলায় লেখা – আমার ব্যক্তিগত বাংলা ব্লগে (অর্থাৎ যে সাইটে পাঠক এই লেখাটি পড়ছেন) পুনরায় প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।

উল্লেখ্য যে বর্তমানে আমার প্রায় ৫,০০০ ফেসবুক বন্ধু রয়েছে, কিন্তু আমি আগের মতো সক্রিয় বা নিয়মিত নই। তা সত্ত্বেও, যখনই আমার মনে হয় তখনই আমি স্ট্যাটাস আপডেট পোস্ট করি এবং আমার ব্যক্তিগত ব্লগে আমার নতুন বা পুরনো প্রবন্ধগুলিও পোস্ট করার চেষ্টা করি এবং সেক্ষেত্রে আমি সবসময় ফেসবুকে আমার ব্লগ পোস্টের লিঙ্কগুলি শেয়ার করার চেষ্টা করি। এইভাবে, আমার লেখার পাঠকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনও আমার ফেসবুক বন্ধু এবং অনুসারীদের মধ্য থেকেই আসে।

~~~

টীকা


[*] এই ব্লগ পোস্টটি ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত আমার একটি ফেসবুক নোট, ‘Being and Timeline: An Account of My Facebook Life’-এর সম্পাদিত ও হালনাগাদকৃত সংস্করণ-এর বাংলা অনুবাদ (যা হল জেমিনি-কৃত স্বয়ংক্রিয় অনুবাদের সম্পাদিত ভাষ্য)। ইংরেজিতে লেখা মূল লেখাটির শিরোনাম সাজানো হয়েছিল জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের বিখ্যাত গ্রন্থ Being and Time-এর অনুকরণে, যেটির প্রাথমিক অনুবাদ ‘অস্তিত্ব ও সময়রেখা’ শুরুতে কিছুটা সময় রেখে দেওয়া হলেও পরে তা পাল্টে ‘আমার ফেসবুক জীবন’ করা হয়েছে। এই পোস্টের সাথে থাকা কার্টুনগুলি, যেগুলি ইন্টারনেটের বিভিন্ন উৎস থেকে নেওয়া হয়েছিল, মূল ফেসবুক নোটেও ব্যবহৃত হয়েছিল।

আমেরিকাকে লেখা চিঠি

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

(‘আমেরিকা’কে উদ্দেশ্য করে বাংলায় লেখা এই চিঠিটি একটি ফেসবুক পোস্ট হিসাবে প্রথম প্রকাশ করেছিলাম ২০২০ সালের ৭ই নভেম্বর বাংলাদেশ সময় দুপুর নাগাদ, যখন এর তিন দিন আগে হয়ে যাওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল গোটা বিশ্ব। উল্লেখ্য, সেবার অনেক নাটকীয়তার পর বাইডেনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল।)

প্রিয় আমেরিকা,

কেমন আছ? এর আগে তোমাকে কখনো সরাসরি লিখেছি বলে মনে পড়ে না, তবে আজ একটু লিখতে ইচ্ছা করল। অবশ্য আমি জানি না, এ চিঠি তুমি পাবে কিনা, কারণ তোমার বর্তমান ঠিকানা ঠিক কোথায়, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত নই। ‘আমেরিকা’ বলতে অনেকের মত আমিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই বোঝাচ্ছি বটে (যদিও এ নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকতে পারে নানা কারণে, যেমন আস্ত দুটি মহাদেশের নামেও আমেরিকা আছে; তবে সেসব ভিন্ন প্রসঙ্গ), কিন্তু একই সাথে অন্য অনেকের কাছে যেমন, আমার কাছেও অন্য সবকিছুর আগে তুমি ছিলে একটা ভাবনা, একটা প্রতীক। এই অর্থে তুমি অনেকের কাছে ছিলে একটা মোহ, একটা স্বপ্ন (“অপার সম্ভাবনার দেশ”), আবার অনেকের চোখে একটা দুঃস্বপ্ন (“সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি”)।

তুমি সেই আমেরিকা, যার সাথে আমার যুগপৎ ভাললাগা-মুগ্ধতা-আকর্ষণ ও ঈর্ষা-বিদ্বেষের সম্পর্ক ছিল গোড়া থেকেই। যেমন, তরুণ বয়সে – বুয়েটে পড়ার সময় – স্লোগান দিতাম, ‘চীন-মার্কিনের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, অথচ ঠিকই একটা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পর সানন্দে সে সুযোগ আমি লুফে নিয়েছিলাম।

তুমি সেই আমেরিকা, যে একভাবে আমার আত্মপরিচয়ের অংশ হয়ে গিয়েছিলে, এবং এখনো হয়তবা হয়ে আছ অনেকাংশে, দুইটি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট আটটি বছর আমার শিক্ষার্থীজীবন কাটানোর সুবাদে। একটা সময় ছিল, খাগড়াছড়িতে অনেকে আমাকে ‘আমেরিকান সাব’ বলে ডাকত, চিনত।[1] এমনকি বাড়িতেও আমার দুই ভাইপো আমাকে ‘আমি কাকু’ বলেই ডাকত, যে সম্বোধনের ‘আমি’ অংশটা হল ‘আমেরিকান’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ (এই দুই ভাইপো নিজেরা এখন উত্তর আমেরিকান – কানাডার নাগরিক হিসাবে – কিন্তু তাদের ‘আমি কাকু’ উল্লিখিত কোনো অর্থে আর ‘আমেরিকান’ হয়ে যায়নি শেষ পর্যন্ত।)

তুমি সেই আমেরিকা, যা হল ঐতিহাসিক-রাজনৈতিকভাবে পঞ্চাশটি রাজ্য নিয়ে গঠিত একটি ‘যুক্তরাষ্ট্র’। কিন্তু এই বিশাল দেশের মাত্র ছয়-সাতটি অঙ্গরাজ্যে আমি গিয়েছিলাম সেদেশে আট বছর অবস্থানকালে, তাও তিনটি বাদে বাকিগুলিতে খুব অল্প সময়ের জন্য। এগুলির মধ্যে আবার ক্যালিফর্নিয়া বাদে সবগুলিই ছিল ইস্ট কোস্টে, যেখানে আমার যাওয়া সবগুলি রাজ্যই সম্ভবত ছিল ‘ব্লু’ স্টেইট – যেমন নিউইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস, কানেকটিকাট, নিউ জার্সি ও মেইন – যেগুলিতে প্রথাগতভাবে ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আর ক্যালিফর্নিয়াতো অবশ্যই গাঢ় নীল একটি অঙ্গরাজ্য, যেখানে চার বছর ধরে আমার ঠিকানা হয়ে উঠেছিল বার্কলে, যে বিশ্ববিদ্যালয় শহর নানান প্রগতিশীল আন্দোলনের কেন্দ্র হিসাবে ভূমিকা পালন করে আসছে উনিশশত ষাটের দশক থেকে। কিন্তু দুই কোস্টের মাঝখানে বা দক্ষিণে যেসব অঙ্গরাজ্য রয়েছে, সেগুলিতে কোনোদিন পা না ফেলা আমি ‘আমেরিকা’র কতটা আসলে দেখেছি, বা চিনি-জানি-বুঝি?

আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তুমি সেই আমেরিকা, যে স্বভাবতই আমার স্মৃতির একটা বড় জায়গা জুড়ে আছ। তুমি এখন সেই স্মৃতিময় সোনালী অতীত, যেখানে ফেলে আসা বন্ধুদের বেশিরভাগের সাথেই আমার কোনো যোগাযোগ নেই আর, যদিও একদা চিঠিপত্রের মাধ্যমে কারো কারো সাথে যোগাযোগ ছিল, এবং পরে ফেইসবুকের সুবাদে হাতে গোনা কয়েকজনের সাথে নতুন করে যোগযোগ হয়েছে।

এর আগে স্মৃতির আমেরিকায় ফেলে আসা দু’জন বন্ধুকে আমি দু’টি খোলা চিঠি লিখেছিলাম পরপর দু’বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ার কিছুদিন পর, যথাক্রমে ২০১২ ও ২০১৬ সালের নভেম্বর ৯ তারিখে (প্রথমটি ছিল ফ্রান্সিস্কো নামের একজন বন্ধুকে উদ্দেশ্য করে লেখা, যদিও প্রকাশিত চিঠিতে ভুলে তার নাম ‘ফ্রান্সেস্কো’ লিখেছিলাম; দ্বিতীয় চিঠিটা লেখা হয়েছে বার্নার্ডো নামের একজনকে উদ্দেশ্য করে)। এই দু’জন বন্ধুই, যাদের সাথে আমার যোগাযোগ হারিয়ে গেছে, ঘটনাক্রমে ছিল মেক্সিকান বংশোদ্ভূত, যারা আমেরিকায় ‘লাতিনো’ নামে পরিচিত একটা বৃহত্তর বর্গের অন্তর্ভুক্ত।

আজ, যখন অগণিত আমেরিকানের মত সারা বিশ্বের বহু মানুষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল জানার জন্য অধীর অপেক্ষায় রয়েছে, এবং ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থকরা মোটামুটি আশ্বস্ত হয়েছে যে পেনসিলভ্যানিয়াতে তারা জিতে যাচ্ছে, ফলে বাইডেনের পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠাও মোটামুটি নিশ্চিত, আমি আমার স্মৃতির পথ ধরে ফিরে যাচ্ছি ফিলাডেলফিয়া ও ওয়াশিংটন ডিসিতে। সময়টা ছিল ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর।

ততদিনে আমি বার্কলেতে আমার পিএইচডির পড়াশুনা অসমাপ্ত রেখেই দেশে একেবারে ফিরে আসব বলে মনস্থ করেছিলাম, তবে জানুয়ারি ‘৯১ নাগাদ দেশে ফেরার আগে ইস্ট কোস্টে কয়েকজন পুরানো বন্ধুর সাথে দেখা করার ইচ্ছা ছিল। সে অনুযায়ী আমি প্রথমে যাই ফিলাডেলফিয়াতে, যেখানে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়াতে ইতিহাসে পিএইচডি পড়াশুনায় নিয়োজিত আমার নেপালি বন্ধু প্রত্যূষের কাছে গিয়েছিলাম প্রথম। এরপর গিয়েছিলাম ওয়াশিংটন ডিসি, যেখানে – যতদূর মনে পড়ে – মাত্র একজন বন্ধুর সাথেই দেখা করেছিলাম, রাহুল নামে আমার এক ভারতীয় বন্ধু, যে তখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে কাজ শুরু করেছিল (প্রত্যূষ আর রাহুল দু’জনেই ছিল ব্র্যান্ডাইজের সতীর্থ, ঘটনাক্রমে যারা উভয়েই শেষ পর্যন্ত নিজ নিজ দেশে ফিরে এসেছিল)।

ডিসিতে আমি গিয়ে উঠেছিলাম মিনু নামের বার্কলেস্থ আমার এক ইরানি-মার্কিন বন্ধুর বোনের বাসায়। সেখানে এক কি দুই রাত কাটানোর পর একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি বরফে চারিদিক সাদা হয়ে গেছে। আমি ভাড়া গাড়ি চালিয়ে ডিসি গিয়েছিলাম, বরফে গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল না, তবে বিশেষ কোনো বিপত্তি ছাড়াই আবার ফিলাডেলফিয়া ফিরেছিলাম। মাঝপথে প্রিন্সটনেও অল্প সময় কাটিয়েছিলাম আমার আরেক বন্ধুর সাথে। সে ও তার গার্লফ্রেন্ড সম্ভবত ডিসিতে আমার সফরসঙ্গী ছিল, এবং আমরা একসাথেই ফিলাডেলফিয়া ফিরেছিলাম প্রিন্সটন হয়ে – এখন আর ঠিক মনে নেই – তবে প্রিন্সটনে অবস্থানকালীন একটা কাকতালীয় ঘটনা আমার মনে পড়ে। সেখানে আমি Dances with Wolves নামের একটা ছবি দেখতে গিয়েছিলাম, টিকেট কাটতে গিয়ে হঠাৎ দেখি এক পরিচিত মুখ – বার্কলেতে আমার সাথে একই ভবনে (ইন্টারন্যাশনাল হাউস-এ) থাকত, এমন একজন ইরাকি-কানাডিয়ান মেয়ে – যার সাথে আমার আগে সেভাবে আলাপ ছিল না হাই-হেলো ছাড়া। কিন্তু সে আমাকে দেখে চিনল, এবং শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর বলল, তার হাতে নাকি নগদ টাকা একটু কম ছিল সিনেমা দেখার জন্য। আমি সেটা পুষিয়ে দিলাম, এবং সেও আমার মতই একই সারিতে – তবে একটু দূরে – বসে ছবিটা দেখেছিল, একা। কী করছিল সে প্রিন্সটনে, এবং কেন একাই ছবি দেখতে এসেছিল হাতে নগদ টাকা কম নিয়ে? এর দু’তিন সপ্তাহ পরেই – যেদিন দীর্ঘ বিমানযাত্রা শেষে আমি ঢাকায় পৌঁছাই – আমেরিকা যখন ইরাকে হামলা চালায়, মেয়েটি কোথায় ছিল? কেমন লেগেছিল তার? এসব প্রশ্নের উত্তর আর কোনোদিন জানা হয়ে ওঠেনি আমার।

আমার যে বন্ধু প্রিন্সটনে পড়ছিল, তার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ নেই আর আমার।[2] কয়েকবছর আগে জানতে পারি, সে ফিলাডেলফিয়াতে অবস্থান করছিল। এখনো সেখানেই আছে হয়তবা, তবে ঠিক জানি না। আমি এও জানি না বাইডেন জিততে যাচ্ছে, এই সংবাদে সে উল্লসিত কিনা। আমার মনে হয় না, কারণ তার সম্পর্কে যতদূর জানি, সে হয়ত খুশি হত বার্নি স্যান্ডার্সের মত কাউকে এই অবস্থানে দেখতে পেলে।

প্রিয় আমেরিকা, আমি ভাবছি, আমি যদি মার্কিন নাগরিকত্ব নেওয়ার চেষ্টা করতাম, যদি আজ সে দেশের ভোটার হতাম, আমি কি ভোট দিতাম? নির্বাচনের ফলাফল দেখে, বা সেদেশের নির্বাচনী রাজনীতির সার্বিক হালচাল দেখে, আমি কি বিচলিত থাকতাম? আমি কি জর্জিয়া, আরিজোনা, মিশিগান বা নেভাডার মত রাজ্যের ফলাফল জানার জন্য উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকতাম? এই চারটি রাজ্যের মধ্যে আমি শুধু জর্জিয়াতে গিয়েছি, একবার, তবে সেটা আমার শিক্ষার্থীকালে নয়, অনেক পরে, কেয়ার নামক একটি সংস্থার কর্মী হিসাবে, যেটির সদর দপ্তর ছিল ওই রাজ্যের আটলান্টা শহরে। কেয়ার সদর দপ্তরের বাইরেই হোমলেস ও দরিদ্র মার্কিন নাগরিকদের – যাদের অধিকাংশ ছিল ব্ল্যাক – দেখে মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল আমার। আর, ৯/১১-উত্তর বাস্তবতায় বাংলাদেশি পাসপোর্টের সুবাদে এয়ারপোর্টে যে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল, তাতে বহুদিন পরে আমেরিকায় ফেরার অভিজ্ঞতা আমার কাছে মোটেও সুখকর লাগেনি তখন। মনে হয়নি, যে দেশের একটি শহরকে মনে মনে সেকেন্ড হোম হিসাবে বেছে নিয়েছিলাম আমি, সেখানে আমার কোনো জায়গা আছে।

আমার স্মৃতির আমেরিকা, তোমার কথা ভাবছি, আর টিভিতে নির্বাচনের ফলাফল দেখার ফাঁকে গান শুনছি, ‘জর্জিয়া অন মাই মাইন্ড’[3] (ব্র্যান্ডাইজে পড়ার সময় ওয়াকম্যানে লুইস আর্মস্ট্রং-এর গানের একটা ক্যাসেট শুনতাম খুব, যেখানে ‘জর্জিয়া অন মাইন্ড’ গানটা ছিল)। আমি গানটা শুনছি, আর প্রিন্সটনের কাছে কোনো এক সিনেমা হলে দেখা ‘ডান্সেস উইথ উলভ্‌স্‌’ ছবিটার কিছু দৃশ্যের পাশাপাশি নাম-ভুলে-যাওয়া সেই রহস্যময় ইরাকি-কানাডিয়ান নারীর চেহারা আমার মানসপটে ভেসে উঠছে, আর কল্পনায় আমি ফিলাডেলফিয়া থেকে ওয়াশিংটন যাচ্ছি বরফ-ঢাকা রাস্তা ঠেলে।

আমেরিকা, তুমি ভাল থেকো।

– প্রশান্ত

ঢাকা, নভেম্বর ৭, ২০২০

(ফেসবুক পোস্টের সাথে বেশ কয়েকটা ছবি দেওয়া হয়েছিল, যেগুলির বিবরণ চিঠির শেষে দেওয়া হয়েছিল, তবে এখানে বাদ দেওয়া হল। আর ছবিগুলির মধ্যে শুধু একটি – ১৯৯০ সালে তোলা – এখানে রেখে দিলাম।)

টীকা


[1] উল্লেখ্য, ১৯৮২ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (আন্ডারগ্র্যাড পর্যায়ে) পড়তে যাওয়ার পর আমি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত টানা তিনবার প্রতিবছর সামার ভ্যাকেশনগুলি দেশে – মূলত খাগড়াছড়িতে – কাটিয়েছিলাম। এরপর, বার্কলেতে স্নাতকোত্তর পর্বে পড়াশুনার করার সময় (আগস্ট ১৯৮৬ – ডিসেম্বর ১৯৯০) মাঝে এক সেমিস্টারের স্টাডি ব্রেক ও সামার ভ্যাকেশন মিলিয়ে ১৯৮৯ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশে – তখনও মূলত খাগড়াছড়িতে – কাটিয়েছিলাম। ততদিনে খাগড়াছড়ি জেলা শহরে পরিণত হলেও স্থানীয় লোকজন অনেকেই আমাকে চিনতেন, এবং আমিও বহুজনকে চিনতাম, এবং চেনা-অচেনা অনেকের কাছে ‘আমেরিকান সাব’বলে সম্বোধিত হতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম আমি। আমার এই পরিচিতি একবার বেশ অভিনব একটা পরিস্থিতিতে উচ্চারিত হয়েছিল। চিটাগাং থেকে বাসে করে খাগড়াছড়ি যাওয়ার পথে পার্বত্য জেলায় ঢোকার চেক পোস্টের আগে যখন বাস থামে, অনেকের মত আমিও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে বেরিয়ে পড়েছিলাম। এরপর আমাকে রেখেই বাস যখন আবার চলতে শুরু করার পর বাসের হেল্পার খেয়াল করেন যে আমি পেছনে রয়ে গেছি, ফলে তিনি জোরে বলে উঠেছিলেন – চট্টগ্রামী বাংলায় – ‘আমেরিকান সাহেব রয়ে গেছেন’, এবং আমি যখন একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে চলন্ত বাসের উদ্দেশ্যে দৌড় দিতে শুরু করি, বাসের সবাই জানালা দিয়ে দেখছিলেন ছুটন্ত আমেরিকান সাহেবকে! 😀    

[2] আমার এই বন্ধুর সাথে পরে অবশ্য আমার যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়েছে, এবং মাঝখানে – ২০২৩ সালে – তার সাথে আমার মুখোমুখি দেখাও হয়েছে ইউএসএ-তে।  

[3] জর্জিয়ায় বাইডেন জিতেছিলেন খুব অল্প ভোটের ব্যবধানে, ফলে চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানকার ফলাফলের উপর অনেকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখছিলেন, যে সুবাদে ‘জর্জিয়া অন মাই মাইন্ড’ গানটি তখন ভিন্ন এক ব্যঞ্জনার সাথে অনেকের মনে বেজে থাকতে পারে।

বের্নার্দোকে লেখা চিঠি

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

এই লেখাটি হল নিজেকে ‘আজটেক বংশোদ্ভূত’ মনে করত, আমার এমন একজন মেক্সিকান-আমেরিকান বন্ধু বের্নার্দোর কাছে ইংরেজিতে লেখা একটি খোলা চিঠির অনুবাদ।[1] চিঠিটি এমন এক সময়ে লেখা হয়েছিল যখন গোটা বিশ্ব মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করছিল এবং বাংলাদেশে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে একটি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের জীবনহানি এবং ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছিল, যে বিষয়গুলি চিঠিতে উঠে এসেছে প্রাসঙ্গিকভাবে।

~~~

৯ নভেম্বর, ২০১৬, ঢাকা

প্রিয় বের্নার্দো[2],

তোমার কি মনে আছে আমার কথা? আমরা ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে বন্ধু ছিলাম, যেখানে আমরা দু’জনই কিছু সময়ের জন্য ইন্টারন্যাশনাল হাউসে থাকতাম। দীর্ঘ এতগুলো বছর হয়ে গেল – ঠিক পঁচিশ বছর – যখন আমি চিরতরে বার্কলে ছেড়ে চলে আসি এবং তোমার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে হয়তো তুমি এখন চট করে আমার নাম মনে করতে পারবে না বা আমার চেহারা চিনতে পারবে না। তবে আমি নিশ্চিত যে আমরা যে প্রায়ই একসাথে পুল খেলতাম সেটা তোমার মনে আছে। প্রথম দিকে, আমরা আমাদের ব্যক্তিগত পটভূমি নিয়ে খুব কমই কথা বলতাম, যতক্ষণ না একদিন নয় বলের একটি গেইম খেলার ফাঁকে আমাকে জানিয়েছিলে যে তুমি আজটেক বংশোদ্ভূত। এটা ছিল একদিন আমি ‘Glimpses of the Fourth World’ (চতুর্থ বিশ্বের কিছু খণ্ডচিত্র) নামে একটি স্লাইড শো উপস্থাপন করার ঠিক পরে। সেই উপস্থাপনায় আমি বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে তোলা ছবি দেখিয়েছিলাম এবং ১৯৮০-এর দশকে সেই অঞ্চলের আদিবাসীরা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছিলেন, সে সম্পর্কে কথা বলেছিলাম।

বার্কলের ইন্টারন্যাশনাল হাউসে অবস্থানকালে তোলা লেখকের ছবি (১৯৮৬~১৯৯০)

আমি ‘চতুর্থ বিশ্ব’ ধারণাটি ব্যবহার করেছিলাম আদিবাসীদের বোঝাতে যাদের অধিকার এবং স্বার্থ আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত হয়নি। আমার পূর্বধারণা ছিল যে আমার শ্রোতাদের মধ্যে – যারা মূলত ছিল আমাদের মতই ইন্টারন্যাশনাল হাউসের বাসিন্দা – কেউ ‘আদিবাসী’ উৎসের ছিলেন না। কিন্তু তুমি পরে পুল টেবিলের পাশে আমাকে অবাক করে দিয়ে নিজের আজটেক উৎস সংক্রান্ত ঘোষণাটি করো। তোমার ব্যবহৃত সঠিক শব্দগুলো আমার মনে আছে। তুমি আমাকে বলেছিলে, “তুমি কি জানতে যে আমি শতভাগ আজটেক রক্ত বহন করছি [এমন একজন আদিবাসী]”? আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে এটা ছিল আমার প্রতি তোমার নীরব সংহতি প্রকাশের একটি উপায়, এবং এটি বোঝানো যে আমি যেসব বিষয় উপস্থাপন করেছিলাম তা তুমি সহজেই বুঝতে পেরেছিলে।

তবে আমার ভেতরের নৃবিজ্ঞানী সত্তা আমাকে বাধ্য করেছিল এই মন্তব্য করতে, যে, “আসলেই কি বিশুদ্ধ রক্তধারার আজটেক বলে কিছু আছে? বেশিরভাগ আধুনিক মেক্সিকানকে কি অন্তত সাংস্কৃতিক অর্থে মিশ্র-বংশোদ্ভূত হিসেবে গণ্য করা হয় না? উদাহরণস্বরূপ, তোমার প্রথম ভাষা স্প্যানিশ, এবং তুমি নাহুয়াতল বা অন্য কোনো আদিবাসী ভাষা বলো না, তাই অন্তত সাংস্কৃতিক দিক থেকে, তুমি নিজেকে শতভাগ আজটেক বংশোদ্ভূত দাবি করতে পারো না। পারো কি?” তুমি সম্ভবত আমার বক্তব্যটি ধরতে পারোনি, এবং আমাকে একটি অভিনব ও অপ্রত্যাশিত উত্তর দিয়েছিলে, “যদি আমার শরীরে কোনো ইউরোপীয় রক্ত প্রবাহিত হয়, তবে আমি আমার শিরা কেটে তা বের করে দিতে প্রস্তুত।” যদিও আমার নৃবৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ আমাকে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যাযুক্ত (এবং নাৎসি-সুলভ) প্রকৃতি চিনতে শিখিয়েছিল, আমি এটিকে লাতিন (এবং নেটিভ) আমেরিকানদের উপর চাপানো বা তাদের দ্বারা আত্তীকৃত গভীর বর্ণবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া হিসাবেই ধরে নিয়েছিলাম। যাই হোক, আমি মূল প্রসঙ্গ থেকে সরে যাচ্ছি। আজ তোমার কথা মনে পড়ার কারণ হল দুটি ভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ: একটি হল মার্কিন নির্বাচন, যার প্রতি মনে হয় পুরো বিশ্বই গভীর আগ্রহ নিয়ে নজর রাখছে, এবং দ্বিতীয়টি হল বাংলাদেশে আদিবাসীরা যে গভীর বর্ণবাদের শিকার হচ্ছে তা অব্যাহত থাকা।

বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রতি বর্ণবাদী নীতি ও অনুশীলনের ক্ষেত্রে, আমি বিশেষভাবে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার কথা ভাবছি, যা সম্পর্কে ঢাকা ট্রিবিউনে ৭ নভেম্বর ২০১৬ প্রকাশিত একটি রিপোর্ট[3] তোমাকে একটি ধারণা দেবে। সংক্ষেপে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জায়গায়, সরকারি কর্তৃপক্ষ আদিবাসী সাঁওতাল সম্প্রদায়ের উপর উপর পুলিশ এবং স্থানীয় গ্যাংদের দ্বারা জঘন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম – গোবিন্দগঞ্জ, গাইবান্ধায় – জমি পুনরুদ্ধারের জন্য, যা রাষ্ট্র-মালিকানাধীন রংপুর সুগার মিল তাদের বলে দাবি করে, কিন্তু স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায়ের সদস্য এবং কিছু অন্যান্য স্থানীয়রা বিশ্বাস করে যে সরকারি জমি অধিগ্রহণের শর্তানুযায়ী এখন তা তাদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত। উদ্ভূত বিরোধ নিষ্পত্তির শান্তিপূর্ণ উপায় খোঁজার পরিবর্তে, স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল – সম্ভবত ঢাকার কিছু রাজনৈতিক ক্ষমতাধরদের নীরব সমর্থনে – উচ্ছেদ অভিযানে প্রতিরোধকারী সাঁওতালদের উপর পুলিশকে গুলি চালাতে প্ররোচিত করে এবং গুণ্ডাদের শত শত সাঁওতাল পরিবারের ঘরবাড়ি লুট ও পুড়িয়ে ফেলার অনুমতি দেয়। গতকাল পর্যন্ত, কমপক্ষে দুজন সাঁওতাল পুরুষ বন্দুকের গুলিতে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং আরও দুজন সাঁওতাল পুরুষ একই পরিণতি ভোগ করেছেন বলে মনে করা হচ্ছে, যদিও তাদের মৃতদেহ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল যে মূলধারার বেশিরভাগ জাতীয় মিডিয়া এই ঘটনাটি সঠিকভাবে কভার করার পরিবর্তে হয় এটিকে উপেক্ষা করছে, অথবা কেবল ক্ষমতাসীনদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলি উপস্থাপন করছে। আর এই মুহূর্তে, বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত বাংলাদেশি সেখানে কোথাও কিছু ‘উপজাতীয়’ নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে চিন্তিত হওয়ার চেয়ে পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা জানার জন্য বেশি আগ্রহী।

বের্নার্ডো, আমি জানি না তুমি এখনও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকো কিনা, এবং যদি থাকো, তবে তুমি কি সর্বশেষ মার্কিন নির্বাচনে ভোট দিয়েছ? একজন মেক্সিকান-আমেরিকান হিসেবে, আমার মনে হয় না যে ট্রাম্প তোমার প্রিয় প্রার্থী হবেন, কারণ লাতিনোরা সাধারণভাবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিতে বেশি আগ্রহী বলে মনে হয় এবং মেক্সিকান বংশোদ্ভূত ব্যক্তিরা ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্য ও ঘোষণায় সাধারণত অপমানিত বোধ করেছেন। (চার বছর আগে আমি আরেকটি খোলা চিঠি লিখেছিলাম, যা ফ্রান্সিসকোর উদ্দেশ্যে লেখা ছিল, যার নাম আমি তখন ফ্রান্সেস্কো বলে ভুল লিখেছিলাম। তুমি তাকে চিনতে, তাই না? যাই হোক, সময় পেলে তুমি চিঠিটি দেখতে পারো। এটি মার্কিন নির্বাচনী রাজনীতিতে লাতিনোরা কীভাবে একটি মূল ফ্যাক্টর হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে সে সম্পর্কে আলোচনা করে।) তবে, যেহেতু তুমি নিজেকে আজটেক অর্থাৎ আমেরিকা নামের দুই মহাদেশের আদিবাসী গোষ্ঠীসমূহের একটির সদস্য হিসাবে মনে করতে,  আমি ভাবছি যে তুমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নেটিভ আমেরিকানদের যে সাধারণ অসুবিধাগুলো রয়েছে তার সাথে নিজেকে সম্পর্কিত করতে পারো কিনা। তোমার কাছে কি এটি বোধগম্য যে একজন নেটিভ আমেরিকান ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটার বলছেন যে তিনি তার রাজ্যে জিতলেও হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেবেন না?

মূল কথা হলো, বিশ্বের সর্বত্রই আদিবাসীদেরকে তাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো হতাশ করেছে, ক্ষমতায় থাকা দলগুলোর নির্দিষ্ট রাজনৈতিক রং যাই হোক না কেন। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এই দেশে ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দলগুলো একসময় নিজেদেরকে আদিবাসীদের অধিকারের প্রবক্তা হিসাবে উপস্থাপন করেছিল, কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর এমন আইনি ও সাংবিধানিক ব্যবস্থা চালু করতে থাকে যেগুলির প্রচলিত ব্যকাহ্যা অনেকক্ষেত্রে আদিবাসী ধারণার প্রত্যাখ্যান হিসেবেই পরিগণিত হয়। যাই হোক, গত কয়েকদিনে সাহেবগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের সাথে যা ঘটেছে তা একটি ব্যাপক প্রবণতা নির্দেশ করে যে বর্তমান ক্ষমতাসীন জোট আদিবাসীদের অধিকার ও স্বার্থ দেখার চেয়ে নিজেদের সমর্থক শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলোর মন জোগাতেই বেশি আগ্রহী।

আমি বাংলাদেশ সম্পর্কে সর্বশেষ একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। এখানে সরকারের কিছু মহল এই ধারণা প্রচারে খুব সক্রিয় যে বাংলাদেশে ‘আদিবাসী’ শব্দটি প্রযোজ্য নয়, এবং দেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের একটি নতুন উদ্ভাবিত শব্দ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দ্বারা উল্লেখ করা উচিত। প্রসঙ্গত ২০১১ সাল থেকে, সংবিধানের ইংরেজি সংস্করণে ‘minor race’ শব্দটি রয়েছে। নৃবিজ্ঞানে আমার প্রশিক্ষণ আমাকে ‘রেইস’ ধারণাটিকে একটি সামাজিক নির্মাণ হিসাবে বিবেচনা করতে শিখিয়েছে, সমকালীন নৃবিজ্ঞানে বাতিল বলে বিবেচিত রেসিয়াল বর্গ যেমন মঙ্গোলয়েড, ককেশয়েড ইত্যাদির ভিত্তিতে নয়, যার উপর ‘minor race’ (‘নৃগোষ্ঠী’) ধারণাটি প্রতিষ্ঠিত। (এই প্রসঙ্গে তুমি আমার লেখা Beyond Black and White: Reflections on Racism and the Idea of Race পড়তে পারো। এটি আশা করি তোমাকে বুঝতে সাহায্য করবে কেন আমি তোমার নিজেকে শতভাগ আজটেক রক্তের উত্তরাধিকারী হিসাবে দেখার ব্যাপারে স্বচ্ছন্দ ছিলাম না।) বের্নার্ডো, যেহেতু বেশিরভাগ আমেরিকান এবং পুরো বিশ্ব পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্ট কে হবেন তা খুঁজে বের করার চেষ্টায় খুব ব্যস্ত, তাই চলো আমরা একটি দীর্ঘমেয়াদী ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ গ্রহণ করি, এবং নিজেদেরকে মনে করিয়ে দেই যে জাতি-রাষ্ট্র এবং বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা সম্পর্কে আদিবাসীদের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি যা ভোটার এবং রাজনীতিবিদরা যে বিষয়গুলির প্রতি খুব বেশি মনোযোগী তার চেয়েও সমগ্র গ্রহের ভবিষ্যতের জন্য প্রাসঙ্গিক অনেক ভুলকে সংশোধন করতে সহায়তা করতে পারে।

নিজের দিকে খেয়াল রেখো।

প্রশান্ত

ঢাকা, বাংলাদেশ

~~~

পুনশ্চ: আমি তোমাকে বলতে ভুলে গিয়েছিলাম যে আমি এক বছর আগে (২০১৫) বার্কলেতে ফিরে গিয়েছিলাম, যখন আমি ক্যাম্পাস থেকে প্রায় এক ঘন্টার হাঁটা দূরত্বের একটি হোটেলে ছিলাম। সেখানে পৌঁছানোর পরে, আমি ক্যাম্পাসে হেঁটে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম যে আমি যাদেরকে দিক জিজ্ঞাসা করলাম তাদের মধ্যে কিছু পথচারী জানত না ইউসি বার্কলে ক্যাম্পাস কোথায়। তারা ছিল তরুণ শ্বেতাঙ্গ পুরুষ যারা সেই এলাকায় বসবাস করত, কিন্তু তারা তাদের বসবাসের স্থান থেকে অদূরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে জানত না। আমি এটা দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম। তারা কি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যার এমন অংশের প্রতিনিধিত্ব করে যারা অন্যান্য বর্গের ভোটারদের পছন্দকে বাতিল করে দিতে পারে?

~~~

এই চিঠিটির মূল ইংরেজিত ভাষ্য যখন প্রথম পোস্ট করা হয় (বাংলাদেশ সময় ৯ নভেম্বর, ২০১৬, সকাল ১১:৩০ টা নাগাদ), মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল তখনও জানা যায়নি। সে নির্বাচনে পরে ট্রাম্প বিজয়ী ঘোষিত হয়েছিলেন, তবে ফলাফল যাই হয়ে থাকুক না কেন, এই লেখার বক্তব্যে তাতে কোনো হেরফের ঘটত না।


[1] ইংরেজিতে লেখা ও আমার ব্যক্তিগত ব্লগে প্রথম প্রকাশিত মূল চিঠিটির শিরোনাম/লিংক: Letter to Bernardo; এখানে প্রকাশিত বাংলা ভাষ্যটি তৈরি করা হয়েছে জেমিনির (এআই) অনুবাদের ভিত্তিতে, যেখানে বেশ কিছু জায়গায় আমার সম্পাদনাও রয়েছে। তবে সম্পাদনা সত্তেও কিছুক্ষেত্রে অর্থগত অস্পষ্টতা রয়ে যেতে পারে।

[2] ইংরেজি উচ্চারণ অনুসারে Bernardo নামটি বাংলায় হয়ত ‘বার্নার্ডো’ লেখা যেত – জেমিনিও তাই লিখেছিল – কিন্তু বর্তমান বাংলা অনুবাদে এটির স্প্যানিশ উচ্চারণের কাছাকাছি একটি বানান (বের্নার্দো) ব্যবহার করা হয়েছে।

[3] রিপোর্টটির যে লিংক মূল ইংরেজি চিঠিতে দেওয়া হয়েছিল, তা এখন আর কাজ করছে না।   

ফ্রান্সিস্কো, এখন আরও বেশি মানুষ তোমাকে গুনতে শুরু করবে!

(এই লেখাটি হল মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসাবে বারাক ওবামা দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হওয়ার প্রেক্ষিতে ‘ফ্রান্সিস্কো’ নামের এক অভিবাসী মার্কিন বন্ধুকে লেখা আমার খোলা চিঠি, যা বিডিনিউজে প্রকাশিত হয়েছিল ৯ নভেম্বর ২০১২ তারিখে, ইংরেজিতে[১])

প্রিয় ফ্রান্সিস্কো,

তোমার মনে থাকতে পারে যে আশির দশকে যখন আমি যুক্তরাষ্ট্রে আট বছর ধরে ছাত্র ছিলাম, তবে সেখান থেকে দেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পর তোমার সাথে আমার আর যোগাযোগ থাকেনি। ওবামার পুনর্নির্বাচন নিয়ে খবর ও বিশ্লেষণ অনুসরণ করার পর তোমার কথা মনে না এসে পারল না। কারণ সবাই এখন তোমার কথা, মানে সাধারণভাবে লাতিনোদের কথা, বলছে! ল্যাটিন আমেরিকার একটি দেশ থেকে আসা একজন অভিবাসী সিএনএন রিপোর্টারকে কেন তিনি ওবামাকে ভোট দিয়েছেন, তা বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন: “আমরা রিপাবলিকানদের পারিবারিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। কিন্তু তারা আমাদের এখানে চায় না!” তার মন্তব্যের দ্বিতীয় অংশটি আমাকে একটি অসাধারণ গল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা আমি তোমার কাছে শুনেছিলাম ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলেতে, যেখানে তুমি স্নাতক পর্বের শিক্ষার্থী ছিলে আর আমি ছিলাম গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট।

ফ্রান্সিস্কো, যে গল্পটি আমার স্পষ্ট মনে আছে, তা হলো তোমার এবং তোমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের তরুণ বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে আসার সেই দুঃসাহসিক যাত্রা। তোমার জন্ম হয়েছিল মেক্সিকোতে। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে কোনো এক সময়, তুমি এবং তোমার পরিবারের সদস্যরা একটি উন্নত জীবনের সন্ধানে ‘এল নর্তে’ (El-Norte) মানে উত্তর দিকে, সীমান্তের ওপার দিয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা শুরু করো। দুর্ভাগ্যবশত, যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর একটি হাইওয়ে পার হওয়ার সময় তোমরা পুলিশের নজরে পড়ো। তোমাদের সবাইকে ধরে সান দিয়েগোর কাছাকাছি কোনো এক সীমান্তে নিয়ে যাওয়া হয় এবং অন্যপাশে, তিহুয়ানার দিকে, ফেরত পাঠানো  হয়। কিন্তু তোমরা দমে যাওনি, তোমাদের ফেরত পাঠানোর সেই রাতেই তোমরা আবার সীমান্ত পার হয়েছিলে! এই গল্পটি যদি কোনো সিনেমায় দেখতাম, আমি এই মুহূর্তে তোমার জন্য হাততালি দিতাম। দ্বিতীয়বার পার সীমান্ত হওয়ার পর তোমাদের আর কোনো সমস্যা হয়নি। তোমার পরিবারের সদস্যরা ক্যালিফোর্নিয়ার কোথাও বসতি স্থাপন করে এবং সময়ের সাথে সাথে তুমি ইউসি বার্কলেতে ভর্তি হও।

বার্কলেতে, তুমি এবং আমি দুজনেই ইন্টারন্যাশনাল হাউস-এ থাকতাম, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিদেশী ছাত্রছাত্রী এবং ভিজিটিং স্কলাররা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বসবাস করতো। আমরা যাকে আই-হাউস বলতাম, তা যদি আন্তঃসাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে উৎসাহিত করার জন্য তৈরি হয়ে থাকে, তবে বার্কলেতে সামগ্রিকভাবে যে বৈচিত্র্য ছিল, তা ছিল আরও ব্যাপক এবং তুলনাহীন। বিপুল সংখ্যক স্নাতক শিক্ষার্থী, যারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত চেহারাকে প্রতিফলিত করছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্রের জাতিগত বিন্যাস এবং জীবনধারা পছন্দের সম্পূর্ণ বর্ণালীকে তুলে ধরেছিল। আমার মনে আছে, ১৯৯০ সাল নাগাদ, বার্কলেতে আমার পড়াশোনার শেষ বছরে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্নাতক স্তরে সংখ্যালঘু (অর্থাৎ অ-শ্বেতাঙ্গ) শিক্ষার্থীদের তালিকাভুক্তি ৫০%-এর সীমা অতিক্রম করেছিল। দুর্ভাগ্যবশত, এই প্রবণতাটি কিন্তু পরিচিতিগুলোর কোনো ‘মেল্টিং পট‘ তৈরির দিকে ধাবিত বহুসাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়ার মাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঘটেনি। বরং, একটি নতুন ঘটনা লক্ষ্য করা যেতে শুরু করে, যাকে পরে সালাদ বাটির (salad bowl) সাথে তুলনা করা হয়—এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে বিভিন্ন পটভূমির মানুষজন তাদের স্বতন্ত্র পরিচয়কে বিকশিত ও বজায় রেখে সহাবস্থান করে, যার ফলে প্রায়শই বিচ্ছিন্নতার মাত্রা বাড়তে থাকে।

বার্কলের ইন্টারন্যাশনাল হাউস-এ ফ্রান্সিস্কো ও অন্য বন্ধুদের সাথে লেখক (সর্বডানে)

বার্কলেতে আমার চার বছরে, আমি দেখেছি এই জায়গাটি বেশিরভাগ মানুষের প্রতিই সহনশীল এবং উদার ছিল, যার মধ্যে বার্কলের দৃশ্যপটের স্থায়ী অংশ হিসেবে থাকা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গৃহহীন মানুষও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে, ১৯৯০ সালের মধ্যে, ক্যাম্পাসের কিছু অংশ জেন্ট্রিফাইড[২] হতে শুরু করে, যার একটি লক্ষণ ছিল চ্যান্সেলর তিয়েন-এর অধীনে প্রশাসনের একটি পদক্ষেপ—যিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হওয়া প্রথম এশীয় আমেরিকান ছিলেন—ঐতিহাসিক পিপলস পার্ক-কে, যা ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলনের সাথে জড়িত একটি স্থান ছিল, গৃহহীন মানুষদের সরিয়ে দিয়ে একটি ভলিবল কোর্ট বা এরকম কিছুতে রূপান্তরিত করার চেষ্টা। এই ইস্যু নিয়ে দাঙ্গা পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হতেও আমি দেখেছিলাম, কিন্তু ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে আমি যখন যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে চিরতরে চলে আসি, তখন থেকে বার্কলের সাথে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় আমি জানি না শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল, যদিও আমি এই স্থানটিকে আমার মনে আমার দ্বিতীয় বাড়ি হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে আমার মনে আছে, আমার যাত্রার শেষ ভাগে ব্যাংককে যখন ঢাকা-গামী ফ্লাইটে উঠছি, ঠিক তখনই ইরাক আক্রমণের খবর প্রকাশিত হয়, যার সাংকেতিক নাম ছিল অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম। ঢাকায় পৌঁছে, আমি যে হোটেলে চেক ইন করেছিলাম, সেখানকার ডিউটিরত কর্মীদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেও আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল, কারণ তারা সবাই রেডিওতে মগ্ন ছিল। আর রাস্তায় ঘোরাঘুরি করার সময়, আমার দিকে লক্ষ্য করে কটূক্তি—”বুশ! বুশ!” বলে চিৎকার—ধাবিত হচ্ছিল। যদিও সেসময় উপসাগরীয় যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট সিনিয়র বুশের সাথে আমার চেহারার দূরতম সাদৃশ্যও ছিল না, তবুও আমার লম্বা চুল এবং পোশাকের মতো অন্যান্য সূত্রগুলো হয়তো আমাকে বাংলাদেশের সাধারণ পথচারীর চোখে একজন ‘বিদেশী’ বা ‘বুশ’-এর প্রতিনিধিত্বকারী বিদেশী যুদ্ধবাজ বিশ্বের একজন বলে মনে করিয়েছিল।

উপসাগরীয় যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়ে গেলেও, ইরাকে বা পুরো বিশ্বে শান্তি আসেনি। ১৯৯১ সাল থেকে বিশ্ব অনেক বদলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছে; রুয়ান্ডা এবং বসনিয়ার মতো ভয়াবহতা দেখা গেছে;… তারপর ৯/১১ ঘটেছিল, যা যুক্তরাষ্ট্রকে আবার ইরাক আক্রমণের অজুহাত দেয় এবং এরপর দেশটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে যায়; যুক্তরাষ্ট্র এখনও সেখানে, যেমন আফগানিস্তানে, যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে;… অর্থনৈতিক দিক থেকে, আমরা ইউরোর প্রবর্তন এবং চীনের নিরন্তর অর্থনৈতিক উত্থান দেখেছি, যারা তাদের সামরিক শক্তিও বাড়িয়ে চলেছে। বিশ্বকে পুনর্গঠনকারী এমন বড় পরিবর্তন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য প্রধান শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণে বিশ্বের এত অংশে বিভিন্ন সংঘাত চলতে থাকায়, ওবামার পুনর্নির্বাচনের মাধ্যমে শেষ হওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে যে পুরো বিশ্ব আগ্রহের সাথে অনুসরণ করেছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। চার বছর আগে ওবামা যখন ক্ষমতায় এসেছিলেন, তখন ইতিহাস প্রত্যক্ষ করার বা উচ্চ আশার যে অনুভূতি ছিল, এবার তা ছিল না। বরং, এমনও অনেকে আছেন যারা বলছেন যে পাক-আফগান সীমান্তে ড্রোন হামলার মতো বিষয়গুলো—যা বিশ্ব তেমনভাবে স্বীকার করে না এমন অগণিত দুর্ভোগ ও উদ্দেশ্যহীন মৃত্যুর কারণ হয়—নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন ওভাল অফিসে কে আছেন তা সত্যিই কোনো পার্থক্য তৈরি করে না। তা সত্ত্বেও, বিশ্বের অনেক মানুষ, ঠিক অনেক মার্কিন নাগরিকের মতোই, ওবামার পুনর্নির্বাচনে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন, এই ভেবে বা এই আশঙ্কায় যে, এর বিকল্প মানে বিশ্বজুড়ে হয়তো আরও বেশি যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং সব ধরণের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জন্য আরও কঠিন সময় হতে পারত।


বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও আমার ভোটাধিকার

বাংলাদেশেও আমরা আগামী বছরের জন্য সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি, যদিও আমরা এখনও সঠিক তারিখ এবং অনুসরণীয় প্রক্রিয়া সম্পর্কে নিশ্চিত নই। এখানে সাধারণ মানুষের মধ্যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অনুপস্থিতি নিয়ে এক ধরণের অনিশ্চয়তা ও হতাশাজনক মনোভাব বিরাজ করছে, যদিও ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে ১৫ বছরের সামরিক শাসনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে এসেছিল। বাংলাদেশে ফিরে আসার পর আমিও আমার জীবনে প্রথমবার, ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম। এরপর থেকে, এই দেশে আরও চারটি সংসদ নির্বাচন হয়েছে, যার মধ্যে তিনটিই তত্ত্বাবধায়ক সরকার নামক একটি বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অনেক উত্থান-পতনের পর যখন এই অনন্য ব্যবস্থাটি চালু হয়, তখন আমি শিক্ষাগত কারণে দেশের বাইরে ছিলাম। বিভিন্ন কারণে, আমি ১৯৯১ সালের পর অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই ভোট দিতে পারিনি বা দিইনি। কিন্তু এবার, সম্প্রতি আমার ভোটার আইডি কার্ডের জন্য আবেদন করায়, আমি আমার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারব বলে আশা করছি।

আমি জানি যে নির্বাচনী গণতন্ত্র কোনো নিখুঁত ব্যবস্থা নয়, কিন্তু আমরা যে অন্যান্য বিকল্পগুলোর স্বাদ পেয়েছি, সেগুলো আরও বেশি অবিশ্বস্ত। অতএব, আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার অধিকার ও দায়িত্ব পালন করে আমার অংশটুকু পালন করতে চাই। সর্বোপরি, এই সেই দেশ যেখানে আমার জন্ম হয়েছে, যেখানে খাগড়াছড়ি নামক একটি জায়গায় আমার বাবা-মা, দাদা-দাদি, প্রপিতামহ-প্রপিতামহী এবং আরও পূর্বপুরুষেরা জন্মগ্রহণ করেছেন, বসবাস করেছেন এবং মারা গেছেন। আমার আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধব আছেন যারা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু আমি ১৯৯১ সালে আমার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এবং তারপর থেকে এখানে বসবাস করছি। বর্তমানে আমি আমার স্ত্রী এবং এক কিশোর ছেলেকে নিয়ে ঢাকায় থাকি এবং স্বাভাবিকভাবেই এই দেশটি যে পথে চলেছে, সে সম্পর্কে আমার গভীর আগ্রহ রয়েছে।


পরিবর্তিত আমেরিকা এবং ভবিষ্যতের হিসাব

আমি যেমন তোমাকে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি, যুক্তরাষ্ট্র কোন পথে চলেছে, সেদিকেও আমার সমান আগ্রহ রয়েছে। এর অনেক কারণ আছে। আমরা ইতিমধ্যেই বিশ্বের বিভিন্ন অংশে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে আলোচনা করেছি। এরপর রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি, যা আগামী দশকগুলোতে বাংলাদেশকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সাহায্য ও বাণিজ্যের মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য ধনী ও শক্তিশালী দেশগুলো যে নীতি অনুসরণ করে, তার প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দরিদ্র মানুষ, নারী ও শিশু, আদিবাসী মানুষ এবং অন্যদের উপর পড়ে। অতএব, তুমি এবং অন্যান্য মার্কিন ভোটাররা অফিসে কোন ধরনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করো, তা যে আমরা গভীর আগ্রহের সাথে অনুসরণ করি, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

শেষ করার আগে, আমি বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে ফিরে আসার পর কাজের সূত্রে একবার, কেবল একবারই, যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যাওয়ার আমার অভিজ্ঞতাটি তোমার সাথে ভাগ করে নিতে চাই। এটি ছিল ২০০৩ সালে, ৯/১১-এর পর। যে দেশে আমি একসময় আমার জীবনের আটটি বছর কাটিয়েছিলাম, সেখানে ফিরে যাওয়ার অভিজ্ঞতা আমার কাছে মোটেও সুখকর ছিল না। আমি যে পাসপোর্ট বহন করছিলাম, তার কারণে কিছু পদ্ধতি সম্পন্ন করতে আমার কয়েক ঘণ্টা লেগেছিল, যা আমার কাছে খুব একটা যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। আমি জানি, আমার নাম যদি মোহাম্মদ বা হোসেনের মতো হতো, তবে আমার অভিজ্ঞতা আরও খারাপ হতে পারত। যাই হোক, আমি পুরো অভিজ্ঞতাটি নিয়ে বেশি কিছু বলব না, তবে এটি আমার মনে যে অনুভূতি জাগিয়েছিল, তা তোমার সাথে ভাগ করে নিতে চাই। আমার মনে হয়েছিল যেন আমি একটি বিশাল নৌকায় পা রেখেছি, যা দীর্ঘদিন ধরে যেখান থেকেই আসুক না কেন, আশ্রয়প্রার্থী যে কাউকেই গ্রহণ করত। তবে, ২০০৩ সালে আমার শেষ সফরের সময়, পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছিল এবং আমার মনে হয়েছিল আমি এমন এক জায়গায় প্রবেশ করছি যেখানে দরজা বন্ধ হয়ে আসছে, এবং যারা এই নৌকায় শেষবার উঠেছিল, তারাই এখন দরজা পাহারা দিচ্ছে, যাতে কোনো নতুন লোক প্রবেশ করতে না পারে!

গত রাতে প্রেসিডেন্ট ওবামা একটি উদ্দীপক বক্তব্য দিয়েছিলেন, যেখানে তিনি কিছু মহৎ আদর্শের কথা উল্লেখ করেন। আমরা খুশি যে তুমি বা তোমার সহকর্মী লাতিনোরা, এবং একসময় রেভারেন্ড জেসি জ্যাকসন যে ‘রেইনবো কোয়ালিশন‘কে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছিলেন, তার অন্যান্য রঙের প্রতিনিধিত্বকারী ভোটাররা ওবামার মতো কাউকে অফিসে নির্বাচিত করেছেন। আমি নিশ্চিত যে তুমি কখনই ভুলবে না—তবে যেকোনো ক্ষেত্রেই সব দলের জরিপকারী এবং রাজনীতিবিদরা তোমাকে ভুলতে দেবেন না—যে তোমার ভোট গুরুত্বপূর্ণ, এবং এটি কেবল তোমার ব্যক্তিগত আর্থিক অবস্থার জন্য বা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যতের নির্বাচনগুলোতেও সমগ্র বিশ্বের জন্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে এবং করবে।

সুতরাং, ফ্রান্সিস্কো, দয়া করে মনে রেখো যে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি মানুষ তোমাকে গুনতে শুরু করবে, ঠিক তেমনিভাবে বিশ্বের অন্যান্য অনেক মানুষও আগ্রহী হবে জানতে যে তুমি বা তোমার মতো অন্যেরা কী সিদ্ধান্ত নাও। তারা তোমার ভালো বিচারবুদ্ধির উপর নির্ভর করবে!

প্রশান্ত ত্রিপুরা

ঢাকা, ৮ নভেম্বর ২০১২

টীকা


[১] বিডিনিউজে প্রকাশিত মূল লেখাটির লিংক: Francesco, now more people will start counting you! এখানে প্রকাশিত বাংলা অনুবাদ মূলত জেমিনির সহায়তায় করা, যদিও এর কিছু অংশ আমি সম্পাদনা করেছি। চিঠিটি প্রকাশিত হওয়ার পরে আমি বুঝতে পারি, ইংরেজিত আমি আমার বন্ধুর নাম ভুল লিখেছিলাম, যা হওয়ার কথা ছিল Francisco, যে কারণে বাংলায় নামটিকে ‘ফ্রান্সেস্কো’ না লিখে ‘ফ্রান্সিস্কো’ লিখেছি বর্তমান অনুবাদে।  

[২] Gentrification বলতে বোঝায় নিম্ন আয়ের মানুষেরা বসবাস করে, এমন এলাকার মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের ব্যবহারের জন্য রূপান্তরের প্রক্রিয়া।

পদ্মা তালুকদার

এখনো ছকের বাইরে ভাবতে শেখান যে শিক্ষক

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

‘খাহা’য় আমার শিক্ষক ছিলেন এবং এখনো [অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে এই লেখা প্রথম প্রকাশের সময়] আমাদের মধ্যে আছেন, এমন তিনজন চিরশ্রদ্ধেয় ব্যক্তির একজন হলেন পদ্মা তালুকদার (‘খাহা’ হল খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য আমার দেওয়া সংক্ষিপ্ত নাম, যা দিয়ে স্কুলটির প্রাক-সরকারি পর্বকে বিশেষভাবে বোঝাতে চেয়েছি)। বহুকাল ধরে তাঁর সাথে আমার কোনো দেখাসাক্ষাত বা যোগাযোগ ছিল না, কিন্তু তাঁর কথা আমি শ্রদ্ধার সাথে আলাদাভাবে স্মরণ করতাম যে ধরনের কারণে, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ‘খাহা’র ১ম পুনর্মিলনী উৎসব উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকায় অন্তর্ভুক্ত আমার লেখায় আমি তা একটুখানি উল্লেখ করেছি। ‘খাহা: আমাদের স্মৃতির এক তীর্থ’ শিরোনামের লেখাটিতে পদ্মা তালুকদার সম্পর্কে যা লিখেছিলাম, তার মূল অংশটা নিচে উদ্ধৃত করা হল।

ক্লাস এইটে পদ্মা তালুকদার সম্ভবত বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়াতেন আমাদের। একবার কী একটা বিষয়ে একটা দরখাস্ত লিখতে দিয়েছিলেন অনুশীলনী হিসেবে। বিষয়টা ঠিক মনে নেই, যেটা মনে আছে তা হল, দরখাস্তের শেষে বিনয়ের আতিশয্যে তথা নতুন শেখা শব্দ জাহির করতে গিয়ে আমি লিখেছিলাম, প্রার্থনা মঞ্জুর হলে আমি ‘মহাত্মনের চিরকিংকর হইয়া থাকিব’। (কিংকর শব্দটা – যার অর্থ ভৃত্য – আমি পেয়েছিলাম আমার প্রিয় হয়ে ওঠা একটি বাংলা অভিধান ঘেঁটে। সেটা ছিল রাজশেখর বসু প্রণীত ‘চলন্তিকা’, যা আমি স্কুল থেকে পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলাম, এবং এখনো আমার সাথে আছে।) পদ্মা ম্যাডাম আমাকে বলেছিলেন, কৃতজ্ঞতার যত কারণই থাকুক, কারো কাছে ‘চিরকিংকর’ হয়ে থাকার কারণ নেই। তাঁর সে উপদেশ আমি মনে রেখেছি।

খাহার পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে পদ্মা তালুকদার থাকবেন, এটা আমার ভাবনায় ছিল না। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে তিনি খাগড়াছড়িতে থাকেন না এবং তাঁর বয়সও যথেষ্ট হয়েছে, তিনি যদি না আসতেন, তাহলে সেটা অস্বাভাবিক হত না। এই অবস্থায় ২৩/১২/২০১৭ তারিখের সকালে অনুষ্ঠানস্থলে যখন তাঁকে দেখতে পাই, সেটা ছিল আমার কাছে প্রত্যাশার অতীত একটা পাওনা। মাঝখানে চল্লিশ বছর তাঁকে দেখিনি! তাই তাঁকে দেখতে পেয়েই আমি ছুটে গিয়েছিলাম তাঁর পদধূলি নেওয়ার জন্য, এবং যখন তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াই, কেন জানি আমার প্রয়াত মায়ের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। আমি তাঁকে প্রণাম করার পর যখন নিজের পরিচয় দিলাম, তিনিও বললেন, “তোমাকে দেখে তোমার মায়ের কথা মনে পড়ছে”।

পদ্মা তালুকদারের সাথে আমি ও আমার খাহার দুই সহপাঠী পুলকজীবন খীসা এবং যুথিবিকা চাকমা, ২৩ ডিসেম্বর ২০১৭

পুনর্মিলনী উৎসবের ‘স্মৃতিচারণ’ পর্বে আমাকে মঞ্চে বসতে হয়েছিল একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে। সেই সুবাদে আমার সময়কার খাহার যে তিনজন শিক্ষক এখনো [অর্থাৎ ২০১৭ সালের ডিসেম্বর নাগাদ] আমাদের মাঝে রয়েছেন – অনন্ত বিহারী খীসা, পদ্মা তালুকদার ও ধর্মরাজ বড়ুয়া – তাঁদের সবার সাথে একই মঞ্চে কিছুক্ষণের জন্য বসার অপ্রত্যাশিত এবং বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার [উল্লেখ্য, উল্লিখিত শিক্ষকদের মধ্যে অনন্ত স্যার আমাদের মধ্যে আর নেই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে]। ঘটনাক্রমে পদ্মা তালুকদার বসেছিলেন আমার পাশের একটি আসনে, তাই অন্যদের কথার ফাঁকে তাঁর সাথে টুকটাক আলাপের সুযোগ পাওয়া আমার জন্য ছিল বিশেষ সৌভাগ্যের ব্যাপার।

স্মৃতিচারণ পর্বের শেষদিকে যখন তাঁর কথা বলার পালা এল, পদ্মা তালুকদার আবার মনে করিয়ে দিলেন, কেন তাঁর মত একজনকে শিক্ষক হিসেবে পাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য সৌভাগ্য ও গৌরবের বিষয়। সভাস্থলে দর্শক-শ্রোতাদের কাতারে বা মঞ্চে উপবিষ্টদের মধ্যে যে নারীদের উপস্থিতি কম ছিল, এ প্রসঙ্গে তিনি কথা বললেন শুরুতেই। (উল্লেখ্য, ১৯৭৭ সাল নাগাদ খাহার শিক্ষকদের মধ্যে পদ্মা তালুকদার ছিলেন একমাত্র নারী, এবং খাহার ২০১৭ সালের পুনর্মিলনী উৎসবের স্মৃতিচারণ পর্বেও তিনি ছাড়া মঞ্চে উপবিষ্ট অন্য সবাই ছিলেন পুরুষ। সকালের মূল অধিবেশনেও মঞ্চে উপবিষ্ট কমপক্ষে এক ডজন বিভিন্ন পদাধিকারীর মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন নারী, খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের [তৎকালীন] প্রধান শিক্ষক।) এসব ক্ষেত্রে নারীদের যথাযথ অংশগ্রহণ বা প্রতিনিধিত্ব না থাকার বিষয়টি নিয়ে সকালের অধিবেশনে মন্ত্রী-আমলা-স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কেউ যে কিছুই বলেননি, এ বিষয়টাও পদ্মা তালুকদার উল্লেখ করতে ভোলেননি তাঁর বক্তব্যে। শিক্ষাঙ্গনে দীর্ঘকাল ধরে সারাদেশ জুড়ে কিভাবে নকল হয়ে এসেছে, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছিল, এসব প্রসঙ্গও সারাদিনে একমাত্র তিনিই ওঠালেন। পুনর্মিলনী উৎসবের প্রধান অতিথি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ যদি তখনো থাকতেন, তাহলে এই বক্তব্যের কোনো সদুত্তর দিতে পারতেন কিনা জানি না।

আমাদের দুর্ভাগ্য, পদ্মা তালুকদার যখন কথা বলছিলেন, ততক্ষণে অনুষ্ঠানস্থলে কোনাল-আইয়ুব বাচ্চু প্রমুখের গান শুনতে আসা মানুষদের ভিড় বাড়তে শুরু করেছিল। এই অবস্থায় যখন তাঁকে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার জন্য একাধিকবার তাগাদা দেওয়া হয়, সেটা অনুষ্ঠানের সভাপতির পরামর্শে নাকি সঞ্চালকের নিজের সিদ্ধান্তে করা হয়েছিল জানি না। যাই হোক, রামগড়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের শেষ পর্ব কিভাবে কেটেছিল, কিভাবে শিক্ষকতার দিকে তিনি ঝুঁকেছিলেন, এসব বলতে না বলতেই পদ্মা তালুকদারকে স্মৃতিচারণ গুটিয়ে আনতে হয়েছিল। ফলে খাহাতে তিনি কখন কিভাবে শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন, এখানে তাঁর অভিজ্ঞতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক কী ছিল, এসব কিছুই আর শোনা হয়ে ওঠেনি। এই প্রেক্ষিতে আমার মনে যে প্রশ্ন জেগেছিল, তা ছিল এমন:

যে সমাজ-সংস্কৃতি-রাষ্ট্র আমাদের ক্ষমতাধর ও বিত্তবানদের কিংকর হয়ে থাকতে শেখায়, সেটির মধ্যে থেকে কেউ যখন মাথা উঁচু করে চলার কথা বলেন, তা শোনার আগ্রহ বা বোধশক্তি আসলে কতজনেরইবা থাকতে পারে?

অথচ সকালের অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রীর অনাবশ্যক দীর্ঘ বক্তৃতা চুপচাপ সয়েছিলাম আমরা সবাই (সেদিনকার প্রেক্ষিতে মন্ত্রী মহোদয়কে উদ্দেশ্য করে লেখা একটা আমার একটা খোলা চিঠি: মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সমীপে) । সেটির বদলে যদি পদ্মা তালুকদার বা তাঁর মত অন্য কোনো বক্তাকে বেশি কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া যেত, তাহলে অন্তত আমি ১ম পুনর্মিলনী উৎসবের আলোচনা পর্বগুলি মনে রাখতাম আরো বেশি সন্তুষ্টি ও উচ্ছ্বাসের সাথে।

পদ্মা তালুকদারের অভিজ্ঞতা ও ভাবনার কথা সরাসরি তাঁর কাছে থেকে অনেকক্ষণ ধরে শোনার যে সুযোগ এবার হাতছাড়া হল, আশা করি আগামীতে – যদি তেমন সুযোগ আবার আসে – তা আর হতে দেব না আমরা। তাঁর দীর্ঘায়ু ও সুস্থতা কামনা করছি।

~~~

(এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে, একটি ফেসবুক নোট হিসাবে, যে নোটের উপর একাধিক প্রাসঙ্গিক মন্তব্য রয়েছে, যেগুলি আগ্রহী পাঠক দেখে নিতে পারেন। ফেসবুক নোটটিকে দু’এক জায়গায় সামান্য সম্পাদনা করে এই ব্লগ ভাষ্যটি প্রকাশ করা হল।)

বাংলাদেশের আদিবাসী নারীদের সংকট ও সংগ্রাম

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

[এই পোস্টটি হল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ পরিচালিত  ‘জেন্ডার, নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন’ বিষয়ক পঞ্চদশ অনলাইন সার্টিফিকেট কোর্সের আওতায় ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ অনুষ্ঠিত ‘জেন্ডার ও মানবাধিকার: আদিবাসী নারীর ক্ষমতায়ন ও সংগ্রাম’ শীর্ষক একটি অনলাইন ক্লাসে উপস্থাপিত আমার বক্তব্যের সারসংক্ষেপ।  এক্ষেত্রে যে পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশন আমি ব্যবহার করেছিলাম, নিচে মূলত সেটিই তুলে ধরেছি আমার উপস্থাপনার বুলেট পয়েন্টগুলিকে বেশ কিছু জায়গায় একটু বিশদ করার পাশাপাশি কিছু প্রাসঙ্গিক টীকা জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে। কোর্সের অংশগ্রহণকারীদের পড়ার জন্য দেওয়া আমার দু’টি নিবন্ধের লিংকও পোস্টে রয়েছে। এই দুটি লেখার একটি হল আমার বহুজাতির বাংলাদেশ গ্রন্থে সংকলিত ‘বাংলাদেশের আদিবাসী নারীদের সংকট ও সংগ্রাম’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ, যেটির লিংক ধরে ডাউনলোড করে নেওয়া যাবে এমন একটি পিডিএফ ফাইলের সন্ধান নিচে পাবেন আগ্রহী পাঠক।]

এক নজরে আলোচনার প্রধান বিষয়াদি

  • আদিবাসী নারীদের প্রেক্ষিতে কিছু তাত্ত্বিক ও ধারণাগত বিষয়ের পর্যালোচনা
  • জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিসরে বাংলাদেশের আদিবাসী নারী
  • আদিবাসী সমাজসমূহে নারীদের অবস্থান
  • আদিবাসী নারীদের সংগ্রামে অন্যরা কিভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে

আদিবাসী নারীদের প্রেক্ষিতে কিছু তাত্ত্বিক ধারণাগত বিষয়ের পর্যালোচনা

জাতীয় রাষ্ট্রীয় পরিসরে বাংলাদেশের আদিবাসী নারী

  • আদিবাসী নারীরা প্রথমত আদিবাসী হিসাবে বৈষম্যের শিকার
    • আদিবাসীদের ভাষাগত ও পরিচয়গত স্বাতন্ত্র্যের যথাযথ স্বীকৃতি নেই
    • আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি নেই
  • আদিবাসী নারীরা একই সাথে নারী হিসাবেও বৈষম্যের শিকার
    • বাংলাদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীরা যেসব বাধার মুখে পড়ে, আদিবাসী নারীদের ক্ষেত্রেও সেগুলি কমবেশি প্রযোজ্য
  • যৌন সহিংসতা ও জাতিগত নিপীড়ন

আদিবাসী সমাজসমূহে নারীদের অবস্থান

  • ‘মাতৃতান্ত্রিক সমাজ’ বিষয়ক কিছু ধারণাগত বিভ্রান্তির সূত্রে অনেকে মনে করেন যে, আদিবাসী সমাজে নারীরা যথেষ্ট স্বাধীন ও ক্ষমতাবান। বাস্তবতা তা বলে না।
  • সম্পত্তির উত্তরাধিকার। কিছু ব্যতিক্রম বাদে, অধিকাংশ আদিবাসী জাতির নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার।  
  • শ্রম বিভাজন
  • গার্হস্থ্য ও যৌন সহিংসতা
  • শ্রেণিভেদে আদিবাসী নারীদের অবস্থান ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতা
    • জনপরিসরে নারীদের উপস্থিতি ও চলাফেরা
    • প্রকাশ্যে ধুমপান

উপরে তুলে ধরা বিভিন্ন বুলেট পয়েন্টের আওতায়  যে বক্তব্য আমি পেশ করেছি, তা পাওয়া যাবে শ্রোতাদের জন্য  একটি পিডিএফ ফাইলের আকারে  বিতরণ করা  ‘বাংলাদেশের আদিবাসী নারীদের সংকট ও সংগ্রাম’ শীর্ষক আমার এক নিবন্ধে। আগ্রহী পাঠকের জন্য একই পিডিএফ ফাইল এখানে দেওয়া  হল।

আদিবাসী নারীদের সংগ্রামে অন্যরা কিভাবে পাশে দাঁড়াতে পারে

  • সুজাতা ও সাগরীর কাহিনী
  • সুজাতা ও সাগরীর জন্য ন্যায়বিচারের দাবি কেন জোরেশোরে ওঠা দরকার ছিল
    • তুমি যদি ভেবে থাক, তুমি আমাকে উদ্ধার করতে এসেছ, তাহলে তুমি অযথা নিজের সময় নষ্ট করছ, কারণ তোমাকে আমার দরকার নেইআর তুমি যদি মনে কর, আমার মুক্তির সাথে জড়িয়ে আছে তোমার নিজেরও মুক্তি, তাহলে চল, আমরা একসাথে কাজ করি।”

আলোচনার এই অংশে আমার বক্তব্য শেষ করার সময় যা আমি বলতে চেয়েছি, তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে এই ব্লগে থাকা আমার ‘সুজাতা বা সাগরীর জন্য ন্যায়বিচারের দাবি কেন আপনার ও আমার লড়াইয়েরও অংশ’  শীর্ষক লেখায়।  

 ‘মধু হই হই’ গানে রোহিঙ্গ্যাদের অভিজ্ঞতার বয়ান

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

‘মধু কই কই বিষ খাওয়াইলা’ (বানানভেদে ‘মধু হই হই বিষ হাওয়াইলা’) গানটিকে রোহিঙ্গ্যাদের ঐতিহাসিক বিড়ম্বনার একটি বয়ান হিসেবে শোনার একটি চিন্তা আমার মাথায় ঘুরতে শুরু করেছিল ২০১৭ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ।[১] আগে এটিকে অন্য সবার মত আমিও দেখতাম স্রেফ একটি জনপ্রিয় গান হিসেবে, যেখানে প্রচলিত ধারণা অনুসারে ‘চট্টগ্রামী বাংলা’য় তুলে ধরা হয়েছে প্রেমে ব্যর্থ বা প্রতারিত একজন মানুষের অনুভূতি। পরিবেশনার ধরন ও প্রেক্ষাপট ভেদে শ্রোতারা ব্যক্তিমনের জাগতিক যাতনা-বাসনার পাশাপাশি লৌকিক প্রজ্ঞা ও কৌতুকের মিশেলও হয়তবা বিভিন্ন মাত্রায় খুঁজে পান গানটিতে, কিন্তু এটির কথাগুলিতে রোহিঙ্গ্যাদের[২] অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি শোনার চেষ্টা আগে হয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

উল্লেখ্য, আরো অনেকের মত আমিও গানটি প্রথমে শুনেছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, দরিদ্র শ্রেণীভুক্ত জাহিদ নামের এক শিশুর কণ্ঠে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের জন্য বিছানো একটি ছাতার নিচে ইমরান হোসেন নামের একজন সমঝদার ব্যক্তি নিজের বাদ্যযান্ত্রিক অনুষঙ্গ (উকুলেলে) সহযোগে ছেলেটির গাওয়া গানের একটি ভিডিও তুলিয়ে ফেসবুকে আপলোড করার পর (২০১৫ সালের ডিসেম্বরে) তা বিভিন্ন মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা এক পর্যায়ে বিজ্ঞাপনের বিষয় হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। একই গান নাকি পরে উঠে এসেছিল ২০১৭ সালে মুক্তি পাওয়া একটি ঢালিউডি ছায়াছবির শিরোনামে (‘মধু হই হই বিষ খাওয়াইলা’) তথা ছবিটির একটি ‘আইটেম সং’ হিসেবেও। এগুলি ভিন্ন কাহিনি, যদিও একেবারে অপ্রাসঙ্গিক নয়। যাই হোক, আমি সংক্ষেপে বলি কেন আমার মনে হয়েছে মূল গানটিতে রোহিঙ্গ্যাদের সমকালীন অভিজ্ঞতার প্রতিধ্বনি থাকা অসম্ভব নয়।

কক্সবাজারের সৈকতে শিশু জাহিদ ‘মধু হই হই’ গানটি গাইছে (ইন্টারনেট থেকে নেওয়া ছবি)

উল্লিখিত সম্ভাবনার কথা আমার মাথায় এসেছিল কিছুটা কাকতালীয়ভাবে, ২০১৭ সালের আগস্টে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেড়াতে গিয়ে, যখন একাধিক ঘরোয়া গানের আসরে অংশ নিয়েছিলাম মূলত শ্রোতা হিসেবে। তখন দেশটির দুই প্রান্তে, যথাক্রমে ক্যালিফর্নিয়া ও ম্যাসাচুসেটসে,  দু’টি আলাদা বাসায় যে দু’জন ব্যক্তির গাওয়া গান ছিল সবার প্রধান আকর্ষণ, তাঁদের কেউ আমার পূর্বপরিচিত ছিলেন না এবং তাঁরা একে অপরকেও চিনতেন না। উভয়ের বয়স ও জন্মসূত্রে প্রাপ্ত পরিচয়েও পার্থক্য ছিল – একজন ছিলেন তরুণ প্রজন্মের, আরেকজন প্রবীণ; একজন নারী, অন্যজন পুরুষ; একজন জন্মসূত্রে বাঙালি, আরেকজন মারমা। তবে উভয়েই ছিলেন অভিবাসী বাংলাদেশি, এবং তাঁদের পরিবেশনায় কিছু ‘আঞ্চলিক’ গানও ছিল, যেগুলির একটি ছিল ‘মধু কই কই বিষ খাওয়াইলা’। সেই সূত্রে আগস্টের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহ জুড়ে গানটি আমার মাথায় – মাঝে মধ্যে গলায়ও – গুন গুন করে বেজে চলছিল হালকা মেজাজেই।

কিন্তু উল্লিখিত সময়কালের কিছুদিন পরই, আগস্টের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে, মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক বিপন্ন রোহিঙ্গ্যার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার – বা সে চেষ্টা করার – খবর আসতে থাকে। এই প্রেক্ষাপটে ‘মধু কই কই’ গানটির উৎস সংক্রান্ত একটি তথ্য নতুন আঙ্গিকে চিন্তার খোরাক হয়ে ওঠে আমার জন্য। এটির মূল রচয়িতা-সুরকার-গায়ক হলেন আবদুর রশিদ (বানান ভেদে আব্দুর রশীদ) মাস্টার নামের একজন ব্যক্তি, যাঁর সম্পর্কে আগে অল্প একটু জেনেছিলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তবে আর্থসামাজিকভাবে নিম্নবর্গভুক্ত এই শিল্পী সম্পর্কে একটা নতুন তথ্য ২০১৭ সালে আমেরিকায় ভ্রমণরত অবস্থায় প্রথম শুনি, তা হল, তাঁর আদি নিবাস নাকি ছিল রাখাইন প্রদেশে। তথ্যটি অন্য কোনো সূত্রে যাচাই করতে পারিনি, তবে এটি যিনি দিয়েছিলেন – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী আমার পরিচিত একজন বাংলাদেশি ভদ্রলোক – তিনি নাকি ২০০৬ সালের দিকে আবদুর রশিদের নিজের গলায় গানটি শুনেছিলেন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে।[৩] সেখানে নাকি তাঁদের বলা হয়েছিল, মংডু নামক স্থানে একজন ভালোবাসার নারীকে না পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গানটি রচিত হয়েছিল।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ‘মধু কই কই’ গানটির মূল রচয়িতা যদি আসলেই একজন ‘রোহিঙ্গ্যা’ উৎসের ব্যক্তি হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর সম্প্রদায়ের অগণিত মানুষ যে ধরনের নিপীড়ন-নির্যাতন ও দুর্দশার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে ও গানে অন্তত পরোক্ষভাবে হলেও উপস্থিত থাকতেই পারে! তবে রশিদের পূর্বপরিচয় বা গানটি রচনার সময় তাঁর নিজের ভাবনা যাই হয়ে থাকুক না কেন, আমরা যদি ‘মধুর নাম করে বিষ খাওয়ানো’ বিষয়ক কথাগুলি একটু ভিন্ন অর্থে পাঠ করি, তা কি খুব অবান্তর হবে? মানবতাবাদ থেকে শুরু করে জাতীয়তাবাদ, ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ, শ্রেণীসংগ্রামের চেতনা – বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে বহু লোক আপাতদৃষ্টিতে সহমর্মিতা মেশানো বিবিধ মধুর বচন সহকারেই রোহিঙ্গ্যাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে আসছেন, বা দেওয়ার দাবি করছেন, বহুকাল ধরে। কিন্তু বাড়ানো হাতগুলির পেছনে যেসব ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে, তাদের অনেকের অন্তরে যে নানান ধরনের (যেমন সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার বা ভূরাজনৈতিক স্বার্থের) বিষ লুকিয়ে নেই, তা কি আমরা বলতে পারি?

টীকা


[১] এই নিবন্ধটি হল ১১ই সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে একটি ফেসবুক পোস্ট হিসাবে প্রথম প্রকাশিত আমার একটি লেখার ঈষৎ সম্পাদিত ভাষ্য।   

[২] ‘রোহিঙ্গ্যা’ নামার বানানে আমি সচেতনভাই একটি য-ফলা ব্যবহার করি। কেন তা করি, এ বিষয়ক একটি ব্যাখ্যা রয়েছে আমার একটি লেখায়, যা এই ব্লগেই রয়েছে: রোহিঙ্গ্যা: অদেখা যে পড়শি ঠিক অচেনা নয়!  (এই ব্লগ পোস্টের প্রথম টীকাতে রয়েছে উল্লিখিত ব্যাখ্যা।)

[৩] ২০১৯ সালে বিডিনিউজে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে  (‘প্রকাশ্যে এলেন ‘মধু হই হই’ গানের মূল শিল্পী’) আবদুর রশীদের পরিচয় ও ‘মধু হই হই’ গান সম্পর্কে তাঁর ব্যাখ্যা কিছুটা জানা যায়, তবে তিনি জন্মসূত্রে বা বেড়ে ওঠার সুবাদে ‘রোহিঙ্গ্যা’ (আরাকান থেকে আসা) কিনা, এ বিষয়ে কোনো তথ্য সেই লেখায় নেই।  

লেখা ও নখার জন্মদিনে আমার দুটি কথা

~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~

‘লেখা’ ও ‘নখা’ হল জাতিগতভাবে ত্রিপুরা উৎস থেকে আসা দুইজন নভোচারী, যাদের জন্ম হয়েছিল আমার কল্পনায়, ‘লেখার চিঠিগুলি: একটি স্বপ্নের গল্প’ নামক একটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর চরিত্র হিসাবে। গল্পটি লেখা হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৭ জুলাই, যে তারিখটিকে লেখা ও নখার জন্মদিন হিসাবে বিবেচনা করা যায়। দিনটির কথা আলাদা করে মনে রয়ে গেছে গল্পটি লিখে ফেলার পর ফেসবুকে দেওয়া একটা পোস্টের সূত্রে, যেটির স্ক্রিনশট নিচে তুলে দিলাম।

আমার গল্পটি – যেটি এই ব্লগে রয়েছে – যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা জানেন যে এটির মূল চরিত্র লেখা ও নখাকে গল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখা যায় কখনো শিক্ষার্থী, কখনো নভোচারী, আবার কখনোবা গ্রামের স্কুল শিক্ষকের ভূমিকায়। তাদের দেখা যায় ভিন গ্রহ থেকে আসা ‘মচোভি’ নামের (যা হল ‘মড়া চোখের ভিনগ্রহী’ কথার সংক্ষিপ্ত রূপ) কিছু এলিয়েনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে, যে ‘মচোভি’ নামটির ইংরেজি রূপ হিসাবে ADE এক্রোনিমটি (উচ্চারণ ‘এইড’, Android with Dead Eyes থেকে বানানো) আমার উপরে উদ্ধৃত ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছিলাম।

উল্লেখ্য, ‘লেখার চিঠিগুলি’ গল্পে ‘আদিবাসী’ ও ‘আদি-আদিবাসী’ নামক দুইটি ভিন্ন বর্গের মানুষদের কথা উল্লেখ করেছিলাম। নখা ও লেখারা হল ‘আদি-আদিবাসী’, যে বর্গের আওতায় পড়ে পৃথিবীর বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ বংশোদ্ভূত লোকেরা। আর ‘আদিবাসী’ হল মঙ্গলগ্রহে (বা পৃথিবীতে) বসবাসরত যে কোনো মানুষ যাদের উপর মচোভিরা ভর করেনি। ২০১৩ সাল নাগাদ আমি ‘আদিবাসী’ ধারণাটি নিয়ে নতুন করে ভাবছিলাম ও লেখালেখি করছিলাম। এই প্রেক্ষাপটেই ‘আদি-আদিবাসী’ বর্গটি বানিয়েছিলাম ‘আদিবাসী’ ধারণার স্থান-কাল-পাত্র নির্ভর প্রেক্ষিত সাপেক্ষতার বিষয়টিকে সামনে আনার জন্য, যদিও আমার গল্পে বিষয়টা খুলে বলা হয়নি।

এখানে একটু বলে রাখি, বর্তমান ব্লগের বাইরে পাঠকদের অনেকে ‘লেখার চিঠিগুলি’ গল্পটি পড়ে থাকতে পারেন জাতিরাষ্ট্রের কিনারায়: প্রান্তিকতার খাদ থেকে স্বপ্নের মহাকাশে শিরোনামে ২০১৮ সালে প্রকাশিত আমার প্রবন্ধ সংকলনে। এ প্রসঙ্গে পাঠক হয়ত ভাবছেন, প্রবন্ধ সংকলনে গল্প কেন? সেটা একটু ব্যাখ্যা করছি নিচে।

আসলে ‘লেখার চিঠিগুলি’ গল্পটি ছিল আমি লিখব বলে কথা দিয়েছিলাম, এমন একটা প্রবন্ধেরই একটা মিউটেশন, হুট করে পাল্টে যাওয়া রূপ। এই রূপান্তরের পটভূমি তৈরি হয়েছিল ২০১৩ সালের প্রথমার্ধে, যখন আমার স্নেহভাজন এক তরুণ আমাকে জানায় যে, তারা ত্রিপুরা স্টুডেন্টস ফোরাম-এর পক্ষ থেকে Yakhlwi (‘সেতু’) নামে একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ করতে যাচ্ছে, এবং আমি যেন ধারাবাহিকভাবে আট কিস্তিতে কিছু লিখি তাদের জন্য। ধারণাটা আমার পছন্দ হয়েছিল, তাই সানন্দে সম্মতি দিয়ে প্রথম কিস্তি লিখে ফেলি ‘আশি অনুচ্ছেদে বিশ্বভ্রমণ বা ত্রিপুরা শিক্ষার্থীদের সাথে একটি স্বপ্নাভিযান’ শিরোনামে।

Yakhlwi-এর প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সেই লেখাটি যে আট কিস্তির একটি ধারাবাহিক লেখার ভূমিকা, তা বলার পর পরের কিস্তিগুলি কী কী বিষয়ে হবে, সেগুলিরও একটা সংক্ষিপ্ত রূপরেখা তুলে ধরেছিলাম সেই লেখায়। একইসাথে পাঠকদের অনুরোধ জানিয়েছিলাম, তাঁরা যেন প্রতিটি কিস্তির আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমাকে তাঁদের চিন্তাভাবনা ও মতামত জানান। তবে এক্ষেত্রে আমি পাঠকদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পাইনি। তাই দ্বিতীয় কিস্তির জন্য ‘শিক্ষা’ বিষয়ক একটা প্রবন্ধ লিখতে বসে আমার মনে হয়েছিল, গতানুগতিক নিবন্ধের বদলে একটা গল্প লিখলে কেমন হয়? এভাবেই ‘লেখার চিঠিগুলি’ শিরোনামের গল্পটি তথা এর প্রধান দুই চরিত্র লেখা ও নখার জন্ম হয়েছিল ২০১৩ সালের ২৭ শে জুলাই, যেদিন এক টানে গল্পটি লিখে ফেলেছিলাম ব্যাপক আনন্দের সাথে।

উল্লেখ্য, নখা ও লেখাকে আমার গল্পে মঙ্গলগ্রহগামী চরিত্র হিসাবে তুলে ধরার একটা পটভূমি হিসাবে কাজ করেছিল আগের বছর (২০১২সালে) আমার লেখা ‘ত্রিপুরাদের মধ্যে কে প্রথম মঙ্গল গ্রহে যাবে?’ শিরোনামের একটি নিবন্ধ, যা সান্তুআ জার্নালে প্রথম প্রকাশিত হয়, এবং পরে আমার জাতিরাষ্ট্রের কিনারায়: প্রান্তিকতার খাদ থেকে স্বপ্নের মহাকাশে গ্রন্থে সংকলিত হয়।

‘মঙ্গল গ্রহে যেতে আগ্রহী এক ঝাঁক শিশু’ (লেখকের একটি ফেসবুক পোস্ট থেকে নেওয়া ছবি)

বিগত বছরগুলিতে লেখা ও নখার প্রসঙ্গ আমার একাধিক লেখায় বা ফেসবুক পোস্টে চলে এসেছে কোনো না কোনোভাবে। এমন কিছু লেখার প্রসঙ্গ নিচে উল্লেখ করা হল।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ প্যানডেমিক ছড়িয়ে পড়ার প্রথম দিকে, ২৮/৩/২০২০ তারিখে, ‘চীন থেকে পাঠানো লেখার চিঠি’ শিরোনামে একটি কল্পনাশ্রয়ী ফেসবুক পোস্টে আমি লেখা ও নখাকে আবার টেনে এনেছিলাম। তবে লেখাটি যে কাল্পনিক ছিল, এ কথাটা শুরুতে বলা না থাকায় মাঝপথে বা শেষে দেওয়া ব্যাখা হয়তবা খেয়াল করেননি, এমন অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাই একদিন না যেতেই লেখাটা ‘অনলি মি’ করে দিয়ে এ প্রসঙ্গে একটা ব্যাখ্যামূলক নতুন পোস্ট দিয়েছিলাম!

‘নভোচারী নখা ত্রিপুরার ঠিকুজি বিচার’ আমার একটি নিবন্ধ রয়েছে, যেখানে ‘নখা ত্রিপুরা’ চরিত্রটির জন্ম প্রসঙ্গ উল্লেখ করার পর নখাকে ত্রিপুরাদের ‘উসুই’ সম্প্রদায়ভুক্ত একজন মানুষ হিসাবে কল্পনা করে নিয়ে উসুইদের সম্পর্কে তথা প্রাসঙ্গিক আরও দুই একটি বিষয়ে আমার কিছু ভাবনা তুলে ধরেছিলাম।