~ প্রশান্ত ত্রিপুরা ~
(বাংলাদেশে বাঙালি মুসলমান এবং অন্যান্য পরিচয়ের উৎস নিয়ে কিছু ভাবনা)[1]
আমাদের চারপাশে অনেকের মধ্যে এমন একটি প্রবণতা আছে যে তারা জাতিগত বিভাজন বা সংঘাতকে তথাকথিত বংশগতি বা ‘রেস’ (race)-এর নিরিখে ব্যাখ্যা করতে চায়, যার মূল ভিত্তি আসলে ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক বিভাজন। দক্ষিণ এশিয়ার (Southasian[2]) অনেক সংঘাতের ক্ষেত্রেই এটি সত্য। প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা আমাদের যেমনই ভাবতে শেখাক না কেন, আধুনিক নৃবিজ্ঞান আমাদের বলে যে, বিশাল বৈচিত্র্য সত্ত্বেও মানুষ জৈবিকভাবে এক এবং অভিন্ন প্রজাতি। এমনকি সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা বা প্রবণতার দিক থেকেও তারা এক। এই ধারণাটিকে ঊনবিংশ শতাব্দীর জার্মান নৃবিজ্ঞানী অ্যাডলফ বাস্টিয়ান ‘মানবজাতির মানসিক ঐক্য’ (Psychic Unity of Mankind) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু এই মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বর্তমান বাস্তবতাকে বুঝতে কতটুকু সাহায্য করে, যেখানে বিভিন্ন গোষ্ঠী জাতিগত, ধর্মীয় বা রাজনৈতিক পার্থক্যের কারণে তাদের সাধারণ মানবিক পরিচয় দেখতে ব্যর্থ হয় বা অস্বীকার করে?
আমার নিবন্ধ Becoming Bangladeshi মূলত বাঙালি মুসলমান সমাজের দুটি প্রধান সংঘাতের উপর আলোকপাত করে। প্রথমত, বাঙালি মুসলমান সমাজের অভ্যন্তরে দুটি পরিচয়ের মধ্যে একটি অমীমাংসিত টানাপড়েন রয়েছে: ‘বাঙালি’ বনাম ‘মুসলমান’। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ আমল থেকে বাঙালি মুসলমান জনসংখ্যার ভৌগোলিক বিস্তারের ফলে বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত অ-বাঙালি গোষ্ঠীগুলির সাথে বিভিন্ন সংঘাত তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাঙালি মুসলমানদের ঐতিহাসিক উত্থান পর্যালোচনা করে আমি সমসাময়িক বাংলাদেশিদের আত্মপরিচয় ও অতীতের যোগসূত্র নিয়ে আলোচনা করছি।

বাংলার সীমান্ত
বাংলার ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের কাছে সুপরিচিত যে, মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি ১২০৪-১২০৫ সালের দিকে তাঁর বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলে মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এই অঞ্চলটি পরবর্তীতে ‘বাঙ্গালা’ এবং ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল’ নামে পরিচিত হয়। জনশ্রুতি আছে যে, বখতিয়ার খলজি মাত্র ১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে তৎকালীন বাংলার রাজা লক্ষণ সেনকে পরাজিত করেছিলেন। এই তথ্য (বা মিথ) লক্ষণ সেনের অক্ষমতা নিয়ে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী মহলে অনেক ক্ষোভ ও ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের জন্ম দিয়েছে। ইসলাম ধর্মের প্রসার বা বাঙালি মুসলমান কৃষক সমাজের উত্থানের ইতিহাস মোটা দাগে জানা থাকলেও, এই রূপান্তরের পেছনে থাকা জাতিগত ও সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াগুলো বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজ বা সাধারণভাবে দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কাছে খুব কমই স্পষ্ট। এই ক্ষেত্রে রিচার্ড ইটন-এর বই The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760 একটি গুরুত্বপূর্ণ অভাব পূরণ করেছে।
ইটন বাঙালি মুসলমানদের উদ্ভব নিয়ে প্রচলিত কিছু ধারণা খণ্ডন করেছেন। যেমন, একটি প্রচলিত মত হলো, বর্ণপ্রথা বা হিন্দু সমাজের নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বিপুল সংখ্যক বাঙালি ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ইটন যুক্তি দেখান যে, ইসলাম প্রধানত পূর্ব বঙ্গে শিকড় গেড়েছিল, যেখানে আর্য বা ‘সংস্কৃতায়িত’ সামাজিক কাঠামো অন্য অঞ্চলের মতো গভীরভাবে প্রবেশ করেনি। অর্থাৎ, পূর্ব বঙ্গের মুসলমানরা ধর্মান্তরিত হওয়ার আগে অবধারিতভাবে ‘হিন্দু’ বা ‘বৌদ্ধ’ ছিল না। বরং অনেক আদিবাসী জনগোষ্ঠী যারা অনার্য সংস্কৃতির অধিকারী ছিল, তারা বিশেষ কোনো ব্রাহ্মণ বা বৌদ্ধ প্রভাব ছাড়াই ইসলামের সংস্পর্শে এসেছিল। এখানে ইটন যে ইসলামের কথা বলেছেন, তা তলোয়ার বা বাণিজ্যের মাধ্যমে আসেনি; বরং এসেছে ক্যারিশম্যাটিক সুফি পীর ও আউলিয়াদের মাধ্যমে, যাঁরা আজও বাংলাদেশের অসংখ্য মাজার বা দরগায় আধ্যাত্মিকভাবে জীবন্ত হয়ে আছেন।
আদিবাসী কে?
তুর্কি বা মোগল শাসনের সময় পূর্ব বঙ্গে কোন আদিবাসী সম্প্রদায়গুলো বাস করত? এই আলোচনার আগে বলে রাখা ভালো যে, সম্প্রতি বাংলাদেশের সরকারি মহলে ‘আদিবাসী’ (indigenous) শব্দটি এক প্রকার ত্যাজ্য হয়ে উঠেছে। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ বারবার সমালোচনার মুখে পড়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’র প্রতি আচরণের জন্য, যারা এখন জাতিসংঘের পরিভাষা অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচিত হতে চায়। অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এড়াতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিরা প্রায়ই যুক্তি দেন যে বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ নেই।
এমনকি কোনো কোনো সরকারি মুখপাত্র এমনও বলেছেন যে, যারা আদিবাসী দাবি করছে তারা আসলে ‘যাযাবর’ বা ‘সাম্প্রতিক অভিবাসী’ এবং বাঙালিরাই হলো এদেশের প্রকৃত আদিবাসী। গত দুই দশক ধরে বেসামরিক ও সামরিক আমলারা এই অবস্থান নিয়ে চলছেন। মজার ব্যাপার হলো, এই অবস্থান অনেক মর্যাদা-সচেতন বাঙালির আত্মপরিচয়ের সাথে সাংঘর্ষিক, যারা মনে করেন তাদের পূর্বপুরুষরা বাইরে থেকে এসেছেন। উদাহরণস্বরূপ, বাঙালি ব্রাহ্মণ বা উচ্চবর্ণের হিন্দুরা যারা নিজেদের আর্য বংশোদ্ভূত মনে করেন, তারা প্রকারান্তরে অ-আদিবাসী বংশ পরিচয়ই দাবি করছেন। একইভাবে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে যারা নিজেদের শেখ, সৈয়দ, মোগল বা পাঠান দাবি করেন, তারাও কিন্তু দাবি করছেন যে তাদের পূর্বপুরুষরা বাংলার বাইরে থেকে এসেছেন।
ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে দেখা যায়, বাংলা ভাষার ইতিহাসে আর্য প্রভাব থাকলেও এর কাঠামো ও শব্দভাণ্ডারে মুণ্ডা ও সাঁওতালি ভাষার মতো অনার্য অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষার গভীর প্রভাব রয়েছে। দ্বিতীয়ত, ভোট-বর্মি ভাষা পরিবারের (যেমন, কোচ, গারো, ককবরক, মৈতৈ, মারমা ইত্যাদি) প্রভাবও অনস্বীকার্য। অর্থাৎ, আজকের বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয় গঠনে অস্ট্রো-এশিয়াটিক এবং ভোট-বর্মি ভাষী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর বিশাল অবদান রয়েছে।
বিদেশি উৎসের সন্ধান
সাংস্কৃতিক বা ভাষাগত রূপান্তরের মাধ্যমে অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী যে বাঙালি হয়ে উঠেছে, তার বেশ কিছু প্রমাণ আছে। যেমন, রায়, রাজবংশী বা বর্মন উপাধিধারী অনেক মানুষ যারা এখন বাংলা বলেন এবং নিজেদের ‘ক্ষত্রিয়’ হিন্দু দাবি করেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও এথনোগ্রাফিক তথ্য অনুযায়ী তারা মূলত কোচ বা বোড়ো (Bodo) বংশোদ্ভূত। কিন্তু আজ খুব কম মানুষই তা স্বীকার করবেন। এমনকি অনেক বাঙালি মুসলমান পরিবারও ‘শেখ’, ‘সৈয়দ’ বা ‘খান’ উপাধি গ্রহণের পর তাদের আদি শিকড় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে চান না।
উদাহরণস্বরূপ ‘খান’ উপাধিটির কথা ধরা যাক। এটি একটি মঙ্গোল শব্দ যা তুর্কি ভাষায়ও প্রচলিত। মোগল সম্রাটরা এটি অনুসারীদের উপাধি হিসেবে দিতেন। আমার এক সহকর্মী গর্ব করে বলতেন তাঁর পূর্বপুরুষ আফগানিস্তান থেকে এসেছেন। তাঁর শ্যামলা গায়ের রঙ দেখে অন্য এক সহকর্মী একবার কৌতুক করে বলেছিলেন, ‘ভায়া তামিলনাড়ু’, অর্থাৎ তিনি দক্ষিণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত হতে পারেন!
উপরে উল্লিখিত ঘটনাটি রেস (race) এবং ভাষা বা সংস্কৃতির মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ক বিভ্রান্তিকে তুলে ধরে। আধুনিক নৃবিজ্ঞান ‘রেস’ বা বর্ণবাদী ধারণাগুলোকে বাতিল করে দিয়েছে। একই ভাষায় কথা বলা মানুষের বংশগতি ভিন্ন হতে পারে, আবার একই বংশের মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলতে পারে।
অসহিষ্ণু জাতিরাষ্ট্র
দুর্ভাগ্যবশত, মানুষের বৈচিত্র্য সম্পর্কে বর্ণবাদী ধারণাগুলো এখনও বিশ্বজুড়ে টিকে আছে। কারণ আমাদের পাঠ্যবই, গণমাধ্যম, শিল্প ও সাহিত্যে এই ভুল ধারণাগুলোই বারবার প্রচার করা হয়।
ইন্টারনেটের যুগে জাতীয়তাবাদ (Nationalism) – যা মূলত বিকশিত হয়েছিল ‘মুদ্রণ পুঁজিবাদ’-এর প্রসারের সময়কালে[3] – কতটুকু প্রাসঙ্গিক? আমরা কি যোগাযোগ প্রযুক্তির এই যুগে আমাদের বিবিধি পরিচয়কে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি না? এই প্রশ্নগুলো আজ বাঙালি, আদিবাসী বা বিবিধ পরিচয়ের অন্য সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক রাষ্ট্রগুলো যখন তার নাগরিকদের বিবিধ পরিচয় ও আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন এই ভাবনাগুলো আরও জরুরি হয়ে ওঠে।
টীকা
[1] এই লেখাটি আমার ব্যক্তিগত ইংরেজি ব্লগ Neolithic Musings-এ প্রকাশিত “The Roots of Bangladeshi Identities” নামক পোস্টের অনুবাদ (যে কাজে এআই ‘জেমিনি’র সহায়তা নেওয়া হয়েছে, যদিও এআই-কৃত অনুবাদ লেখকের নিজের সম্পাদনার ভিত্তিতে কিছুটা পরিশীলিত করা হয়েছে)। উল্লিখিত ইংরেজি ব্লগ পোস্টটি হল ১১ অক্টোবর ২০১২-এ Himal Southasian-এ প্রকাশিত ‘Becoming Bangladeshi’ নামক একটি প্রবন্ধের অংশবিশেষ। উল্লেখ্য যে, হিমাল-এ প্রকাশিত প্রবন্ধটি মূলত আমার জমা দেওয়া আরও দীর্ঘ একটি লেখা থেকে তৈরি হয়েছে, যার শিরোনাম ছিল: ‘Two Weddings, a Funeral, and Riots in Assam: Musings on Genes, Memes and the Psychic Unity of Humanity’। পরিমার্জন প্রক্রিয়ায় আমার মূল লেখার যে অংশগুলো বাদ পড়েছিল, সেগুলির ভিত্তিতে সাজানো আমার একটি লেখার লিংক এখানে দেওয়া হল: Random Musings on Identity।
[2] আমার মূল ইংরেজি লেখায় ‘দক্ষিণ এশিয়া’-র বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত শব্দটি ‘Southasian’ (South Asian নয়!) যারা Himal Southasian-এর সাথে পরিচিত, তারা হয়তো জানেন যে এই পত্রিকাটি ভৌগোলিক বিভাগ হিসেবে ‘South Asia’ (দক্ষিণ এশিয়া) শব্দটিকে একটি একক শব্দ (Southasia) হিসেবে ব্যবহার করে। এই ব্যবহারের ব্যাখ্যা তাদের ওয়েবসাইটের এখানে দেওয়া হয়েছে।
[3] ‘প্রিন্ট ক্যাপিটালিজম’ (Print capitalism) বা ‘মুদ্রণ পুঁজিবাদ’ ধারণাটি এখানে বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন তাঁর ‘ইমাজিন্ড কমিউনিটিস’ (Imagined Communities) গ্রন্থে যেভাবে ব্যবহার করেছেন, সেই অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।











