‘নিউটন’-এ টাইটেল ক্যারেক্টারের একটা প্রতিকৃতি আছে – ফাঁকা দেওয়াল, ফ্রেমের একদম মধ্যেখানে একটা ব্ল্যাকবোর্ড, সামনে নিউটন (দূর্ধর্ষ, অনবদ্য রাজকুমার রাও), ডানদিকে দরজার দিকে তাকিয়ে, মুখে এনলাইটেনমেন্টের আলো এসে পড়ছে। যারা ছবিটা দেখেছেন তারা জানেন নিউটন কিসের জন্য অপেক্ষমান – দন্ডকারণ্যে ভোটারদের জন্য। কিন্তু শুধুমাত্র যদি ওই ইমেজটাকে পড়ি গল্পটা মাথায় না রেখে, তাহলে অন্য একটা মজা পাওয়া যায় – নিউটন একজন শিক্ষক একটি প্রাইমারি স্কুলে, ছাত্রদের জন্য অপেক্ষমান, শিক্ষা দিতে হবে, ছাত্ররা আসছেনা। পিছনের ব্ল্যাকবোর্ডে হয়তো এরকম অনেক শিক্ষা ঘটেছে, কিন্তু তা মুছে গেছে, এবং সেই শিক্ষা উদ্ধার করা আর সম্ভব নয়। হাতে রইলো পেনসিলের মত পড়ে আছে আদর্শবাদী শিক্ষক আর তার ডিউটি। শুধু তার বদলে এই ছবিতে শিক্ষকের বদলে ছোট আমলা।
আমাদের চলচ্চিত্রবিদ্যায় একটি প্রিয় শব্দ আছে (লুই আলথুজারের মার্ক্সবাদ থেকে ধার করা) – ‘অ্যাপারেটাস’ – যার আমি অপর্যাপ্ত অনুবাদ করেছিলাম এক সময়ে – ‘যন্ত্রকল্প’। ‘নিউটন’ এরকম কয়েকটি যন্ত্রকল্প নিয়ে – এক, গনতন্ত্র; দুই, আমলাতন্ত্র; তিন, ফৌজতন্ত্র। আর আমার মতে ‘নিউটন’ আরেকটি যন্ত্রকল্প নিয়েও – সিনেমা।
এই ছবির যন্ত্র তিনরকমের – ভোটযন্ত্র, অ্যাসল্ট রাইফেল আর ক্যামেরা। সেখানে ক্যামেরা দাঁড়িয়ে আছে ভোটযন্ত্রের পাশে আর সামনে রাইফেল। ছবির ক্লাইম্যাক্সে রাইফেল নায়কের হাতে উঠে আসে – ‘ভারত কা ভার’ – কিন্তু সন্দেহ হয় নায়কের সেই রাইফেলের ট্রিগার টেপার ক্ষমতা আছে নাকি।
সায়ন্তন আর লাবণ্য ঠিক প্রশ্ন ভুল ছবির কাছে করছেন। ‘নিউটন’ দন্ডকারণ্য এবং তাদের মানুষকে ‘রিপ্রেজেন্ট’ করতেই চায়না যে ভুলভাল ‘রিপ্রেজেন্ট’ করবে। ছবিটার মজা আর জোরের জায়গা হল ছবিটা তার সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল; অর্থাৎ ছবিটা জানে যে দন্ডকারণ্যের মানুষ, সেখানকার সমস্যা, সেখানকার রোষ ছবিটার পক্ষে – অর্থাৎ ছবিটার আখ্যানগত ও নির্মাণগত (এবং প্রদর্শনগত, ছবিটাকে সেন্সরের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে, মাল্টিপ্লেক্সে দেখাতে হবে) পরিকাঠামো পর্যাপ্তভাবে করতে দেবেনা; এবং করতে গেলে আধা-খ্যাঁচড়া একটা ব্যাপার ঘটবে। অতএব ছবিটা সেটা করারই চেষ্টা করেনা।
এরপর হচ্ছে আইডেন্টিফিকেশনের খেলা – ন্যারেটিভ যেটার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
আইডেন্টিফিকেশন কার সঙ্গে হবে? কার দৃষ্টি থেকে ছবিটা দেখবো? জঙ্গলের মানুষের দৃষ্টি সম্ভব নয়, মিলিটারির দৃষ্টি সানি দেওলদের ছবি ভালো করে (নির্মাতারাও সেটা চান না), রইলো পরে প্র্যাক্টিকাল/প্রাগমাটিক আমলা আর তার বিপরীতে আদর্শবাদী আমলা নিউটনকুমার, অর্থাৎ শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত, আলোকপ্রাপ্ত ‘ভদ্রলোক’। ছবিটা দ্বিতীয় অপশনটা বেছে নিয়েই সেটাকে নিয়ে ঠাট্টা করতে থাকে – অর্থাৎ দৃষ্টিটাই ছবির সার্কাস্টিক গেজের বস্তু হয়ে যায়। ছবিতে আর কিছুই প্রতিরূপায়িত হয় না, এই ছবির বাস্তব এক এবং একমাত্র নিউটন, গণতন্ত্রের rookie আমলাসত্তা। এখানেই ছবির কমেডি (যা হলভর্তি উচ্চকিত হাসি তুলবে না), ট্র্যাজেডি (যা কাঁদাবে না) এবং অ্যাবসার্ডিটি (যা বাস্তবোচিত লাগবে)। নিউটনই দৃষ্টি, নিউটনই দৃশ্য।
তাহলে দন্ডকারণ্যের প্রেক্ষিতটার ভূমিকা কিসের? এই রগড়টা তুলে ধরার প্রেক্ষাপট মাত্র। ‘মাত্র’ – এই শব্দটাই আমার অনেক তরুণ বন্ধুকে রাগিয়ে দেবে। কিন্তু আমি তো বলেইছি, ছবিটা নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে ওয়াকিবহাল, এবং সেটাই ছবির অন্যতম কনসার্ন প্রায়। এই যে জঙ্গল কেবলই প্রেক্ষাপট, জঙ্গলের মানুষ প্রায় নন-ফিকশনাল এক্সট্রা – ছবিটা এতটুকু করেই তাদের কোনো ব্যর্থ প্রচেষ্টার অন্তর্গত করতে চায়না।
বরং একটি দৃশ্যে এই প্রেক্ষাপটকে সুচারুভাবে বাঙ্ময় করে তোলে (আক্ষরিক অর্থে) এবং আমি বলবো ‘সিনেমার রাজনীতি’ মেনে।
একটি বিশেষ মুহূর্তে ছবিটা একটা কান্ড ঘটায় (এর আগে যেটা ঘটেছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘প্রতিদ্বন্ধী’-তে) আর আমি ভাবলাম এই যে, আবার ঘটলো! যে স্কুলে ভোট হওয়ার কথা সেই স্কুলের দেওয়ালে লাল কালিতে কিছু লেখা আছে। নিউটন তার স্থানীয় সহকারীকে জিগ্যেস করে – মাওবাদীরা লিখেছে এসব? তিনি উত্তর দেন – বাড়ি-ঘর-দোর জ্বালিয়ে দিলে রাগ তো হবেই, তারাই এই রাগী লেখা লিখেছে। অথচ লেখাগুলো আমরা ঠিক পড়তে পারছিনা, ক্যামেরা দেখাচ্ছেনা, এডিটিং দুদন্ড দাঁড়াচ্ছেনা। ঠিক যেভাবে ‘প্রতিদ্বন্ধী’-তে সিদ্ধার্থর আক্রোশের পর দেওয়াল লিখন ব্লার হয়ে যায়, ‘সীমাবদ্ধ’-তে টুটুলের নকশাল বয়ফ্রেন্ডের চিঠি আমরা পড়তে/শুনতে পারিনা।
কিন্তু আসলে এই ‘পাঠ’-টা ডেফারড হয়ে যায় এবং ফিরে আসে অমোঘ সময়ে । ভোট ইতিমধ্যে প্রহসনে পর্যবসিত হয়েছে, পোড়া ঘরবাড়ি ঘেরা স্কুলবাড়ির ভিতরে রঘুবীর যাদব রামায়ণের আত্মসচেতন হাস্যাস্পদ পাঠ দিচ্ছেন এবং জানাচ্ছেন যে এই অরণ্যই হচ্ছে (বা ছবির পরিসর) রামায়ণের আসল নাট্যমুহূর্তের প্রেক্ষিত। অর্থাৎ তারা ভারতবর্ষের অন্যতম মহাকাব্যের ভৌগোলিক কেন্দ্রে আছেন। সেই সময়েই হিন্দুরাষ্ট্র ও হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে দেওয়াল লিখনগুলি স্পষ্ট পড়া যায় একটি ট্র্যাকিং শটে। অতএব ছবিটা তার সীমাবদ্ধতা মেনে বলে যে সে ততটুকুই ‘পড়তে পারবে’ যা ‘পাঠ্য’। সে মধ্যবিত্ত ছাড়া কোনো মানুষের মুখ পড়তে পারেনা, চেষ্টাও করেনা; সে গোন্ড ভাষা বোঝেনা, বোঝারও চেষ্টা করেনা (উলটে রাষ্ট্র ও সামরিক বাহিনীর ‘কম্যুনিকেশন’-এর হিলারিয়াস রগড় চলতে থাকে)। কিন্তু নিউটনকুমার যে বিশ্বাস করেন জ্ঞাপন সম্ভব!
নিউটনকুমার হলেন এ যুগের ভূপতি, যিনি ভাবেন যে শাসকের ভাষা এবং শাসকের নিয়মবিধি মেনে চললেই দেশের উন্নতি হবে। নিউটনকে প্রথমদিকেই আমরা দেখি ফ্রেম উইদিন এ ফ্রেমে, সংবিধানের প্রণেতা আম্বেদকরের ছবির নিচে, আর তক্ষুনি বাড়ির পাওয়ার ট্রিপ করে যায়, নিউটন ফিউজ ঠিক করে দেয়, ঠিক যেমন সে জঙ্গলে ভোটও করে ফেলে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে। এই ছবির হুলটা এখানেই ফোটায় – নিরেট নিউটনই আদর্শবাদী কারণ সে নিরেট, আবার নিরেট নিউটনের মতন লোকেদের দ্বারাই গনতন্ত্র বজায় থাকে, কারণ রাষ্ট্রের এই নিরেটদের প্রয়োজন। অ্যাপারেটাস চলতে থাকে কারণ অ্যাপারেটাস কাজই করেনা, শুধু অ্যাপারেটাসের আমলা-চালক তৃপ্ত হয় যে সে ‘তার কাজ করেছে’। মিলিটারি এই নিরেটদের নিরেটপনা সহ্য করে যায় কারণ একটা সময় আসবে যখন সে এমন ক্যালাবে যে ঘাড় মটকে বেঁচে থাকবে অ্যাপারেটাসের ধারকেরা। এই ছবির সবচেয়ে menacing ব্যাপার হল (মিলিটারি অফিসার আত্মা সিং-এর ভূমিকায় পঙ্কজ ত্রিপাঠির অনবদ্য অভিনয়ের ফলে) মিলিটারির ধৈর্য এবং ইনডিফারেন্স, এই অ্যাপারেটাসের মধ্যে কোন অন্তর্গত হাস্যরস নেই, বা থাকলেও তাকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। মিলিটারি এই ছবির ভিলেন, কিন্তু নিউটনের উঁচিয়ে ধরা বন্দুকে যদি ভাবেন যে ভিলেনকে মধ্যবিত্ত নায়ক দিলো এক হাত – অনেকেই যেমন ভাববেন – তাহলে ভুল ভাববেন। এই মিলিটারি কিন্তু তার শেষ দৃশ্যে মধ্যবিত্তের ভূমিকায় ’ঠিকঠাক অভিনয়’ করতে পারে, আঁচড়টিও লাগে না তার।
নিউটনকুমারের ট্র্যাজেডি হল সে ম্যাথেমেটিকাল বিইং, অংক মিললেই শুধু তার হিসেব মেলে। মিলিটারি অফিসার একসময়ে তাকে ধরিয়ে দেন যে তার অংকের ভাবনার গোড়াতেই গলদ আছে। কিন্তু সে যে বাতিল ‘নিউটনিয়ান’ অংকের জগতেই পড়ে আছে, যেখানে সব অংকের সম্ভাবনা একটাই, ফলও একটাই। নিউটন এই অংকের ট্র্যাপে পড়ে গেছে – তার ৭৬জন ভোটারের যতটা সম্ভব ভোট চাই, শেষে তার মিলিটারির বিরুদ্ধে রিডিকিউলাস প্রতিরোধ চারজনেতেই তৃপ্ত হতে হয়, পাক্কা দুই মিনিট বাকি ভোট শেষ হতে, সে তার বন্দুক বাগিয়ে অপেক্ষা করে (এবং ছবিও) সেই দুইটি টানা মিনিট (সে জানে বন্দুক নামালেই কী হবে), মালকো তার সাথে দেখা করতে এলে সে পাঁচ মিনিট কাজ করেই চা খেতে যাবে, সে ঠিক নটার সময়ে অফিসে এসে অ্যাওয়ার্ড পায় সুষ্টু কর্মের। নিউটনের আদর্শ অতএব এই অংকে আটকে আছে – ছবির শুরুতে সঞ্জয় মিশ্রের রগড় বলে দেয় যে সে সংখ্যাতেই আটকে থাকবে – নিউটনের ট্র্যাজি-কমেডি হল তার আদর্শ সত্ত্বেও তার আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিতে দন্ডকারণ্যের মানুষেরা সংখ্যার চাইতে বেশি কিছু হবেনা, অতএব তার আদর্শ রিডিউকিউলাস, তার ভোটদায়িত্ব সমাপনও একইরকম রিডিকিউলাস।
অতএব নিউটনকুমার দ্বারা এম্বডিড আমলাতন্ত্র যেমন ভারতবর্ষকে দেখতে পায়না, এই ছবিও জানে যে দন্ডকারণ্যের ভারতবর্ষকে এই ছবির দৃষ্টিতে ‘পরিষ্কার করে’ দেখা সম্ভব নয়। যেটা করা যেতে পারে সেটা হল দেখার যন্ত্রটাকেই বিপদে ফেলা। এই ছবিতে ফর্মের দিক থেকে যেটা আয়ত্ত্ব হয়েছে সেটা হল নাটকহীন সময়ের পরম্পরা, বোরডম, স্তিমিত রিয়ালিজম এবং একধরণের সার্কুলারিটি। এই যে গল্প ঘুরে ঘুরে একইজায়গায় ফিরে আসে – নিউটনকুমার সুষ্টু ভোট করাবেনই, আত্মা সিং জানেন ভোট-ফোট এখানে কিছু হবেনা অথচ এই জোকারটিকে তার কাজ চালাতে সাহায্য করতে হবে, ভোটাররা ভোট-ফোট কিছুই বোঝেন না – এই চক্রাকার ভাবটি রিডিকিউলাস তুঙ্গে পৌঁছোয় যখন বগলে জনমতামতের সংখ্যাকে আগলে রেখে নিউটন পালায়, এবং জঙ্গলে প্রায় চক্রাকার ঘুরতে ঘুরতে আত্মা সিং-এর কবলে পড়ে শেষমেশ। এর মধ্যে কিছুই ঘটেনা, না গনতন্ত্রের জয় ঘটে, না নিউটন হিরো হতে পারেন, না তিনি হতে পারেন দন্ডকারণ্যের মানুষের বন্ধু, না তিনি বুঝতে পারেন পাঁচের এবং ছয়ের মানে।
কিন্তু এর বাইরে ছবির ফর্ম প্রায় ভীষণ খারাপ বলা যায় – কিছু ফ্রেম ছাড়া দৃশ্যের পরিকল্পনায় কোনো ভাবনা নেই, শটটেকিং গড়পড়তা আর পাঁচটা ছবির মতই। ইদানিংকালের ছবির যে জিনিসটি আমাকে ইরিটেট করে মারছে (‘সহজপাঠের গপ্পো’-তেও আমার যে অভিযোগ ছিল) এই ছবিতে তা প্রায় দূষণ হিসেবে আছে – অগভীর ইমেজ, শ্যালো ফোকাস, সিলেক্টিভ ফোকাসের ছড়াছড়ি। লাভের মধ্যে যা হওয়ার তাই হয়েছে – জঙ্গল এই ছবিতে কোনরকম চরিত্রই হতে পারেনা। জঙ্গলের একটা opaque চরিত্র পাওয়া খুব দরকার ছিল, যে কিনা নিউটনের কুইকজোটিক গনতন্ত্র বাঁচিয়ে রাখা নির্মোহভাবে দেখতে থাকে। পরিচালক ভাবেন সেটা হচ্ছে, কিন্তু চিত্রগ্রহণ সেটা করতে দেয়না। চিত্রনাট্যের ক্ষেত্রেও ‘ইউনিটি অফ স্পেস’ বজায় রাখলে ভালো হত, নিউটনের চরিত্রের এক্সপোজিশনের জন্য অতগুলো দৃশ্য একেবারেই অবান্তর লাগে পরে। ছবি শুরু করা উচিত ছিল প্রিসাইডিং অফিসারের ট্রেনিং-এর মধ্যে দিয়েই শুধু – ফ্ল্যাশব্যাক, কাট-আওয়ের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
আবার ইমেজের সেই খামতিটা ছবির অর্জনের অন্তর্গতও হয়ে যায় নির্মাতাদের ইন্টেনশন না থাকলেও – এই ছবি স্পষ্ট করে দেয় যে ভারতবর্ষের মেনস্ট্রিমে রাজনৈতিক ছবির সীমাবদ্ধতা। অর্থাৎ সত্তর দশকের ছবি সোশাল রিফর্মিস্ট দৃষ্টি দিয়ে বা কখনো সখনো র্যাডিকাল দৃষ্টি দিয়ে যেভাবে রাজনীতিকে আর্টিকুলেট করতে চেয়েছিল তা আর সম্ভব নয়। বরং ইদানিং ‘পিপলি লাইভ’ জাতীয় ছবির মারফত রাজনৈতিক ছবিকে যেমন টেলিভিশনের কুক্ষীগত করে ফেলেছে, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের ফরমাটে বাস্তবকে খবরে পর্যবসিত করেছে – ‘নিউটন’ হালফিলের সেইধরণের ছবির রাজনীতিকে এক হাত নেয় গল্পের অশ্বডিম্ব প্রসব করে, টেলিভিসুয়াল দৃষ্টিকে অবজেক্টে পরিণত করে। এই ছবির কোনো র্যাডিকাল পলিটিকাল মেসেজ নেই, তাহলে পরিবর্তিত নিউটনকুমার বা জঙ্গলের মানুষরা নায়ক হয়ে উঠতেন। এই ছবির জোরের জায়গা হল ইদানিংকালের এই ধরণের সাবজেক্টের যা যা সম্ভাব্য ন্যারেটিভ সবকটাকেই জ্যাম করে দেওয়া। অর্থাৎ ছবিটি যেহেতু রিপ্রেজেন্টেশন করতে পারবেনা, সেহেতু ছবিটি রিপ্রেজেন্ট করার যন্ত্রকল্পটিকেই বিপর্যস্ত করে দেয়।
তাই যদি বলা হয় এই ছবি রাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা মেশিনের ফসল, খুব বড় ভুল হবে – কারণ তাহলে কেবলমাত্র গল্প দেখা হবে ইনফরমেশন হিসেবে। এই ছবি আদপেই র্যাডিকাল রাজনীতিকে ধারণ করেনা – ছবিতে যখন মাওবাদী দেখা যায় তারা এসে স্রেফ খুন করে দিয়ে চলে যায় কারণ ছবিটা এই দৃশ্যসমূহে বাস্তবকে ধরছেনা, ধরছে বাস্তব সম্বন্ধে আমাদের কাছে যে ‘interpreted খবর’ আসে, সেই খবরের ‘যন্ত্রকল্প’-কে, কারণ এর পরেই সেই অ্যাপারেটাসকে বিপর্যস্ত করা শুরু হবে।
আরেকটু স্পষ্ট করে বলতে হলে – বাস্তব আমাদের পর্দায় আসে বিভিন্ন ইডিওলজিকাল অ্যাপারেটাস ও ফর্মের মাধ্যমে। আমরা যতটা না বাস্তবকে দেখি তার চাইতে অধুনা বেশি দেখি কেবল ‘মিডিয়াম আর ফর্ম’-কে। ডন কুইকজোট (বা কিহোতে) উইন্ডমিলকে ড্রাগন ভাবতেন কারণ তিনি নিজেকে নাইট ভাবতেন। নিউটনকুমার ভাবেন যে তার দায়িত্বপালনে গনতন্ত্র চলবে, তিনি আদর্শবান অতএব আদর্শ আমলা। মুশকিল হল না ওটা গনতন্ত্র চলছে, না তিনি সংবিধানের রক্ষাকর্তা। তিনি নিরেট নাইট, ভাবছেন ক্রুসেড হচ্ছে এবং তাতে তার ভূমিকা আছে। হচ্ছে বোরিং রগড় এবং তাতে তার ভূমিকাও ভীষণ সীমাবদ্ধ, সেই সীমার বাইরে তিনি কখনোই বেরোতে পারবেন না তিনি যে স্কুলে ছাত্র আসেনা সেই স্কুলের মাস্টার, যাকে রোজ ক্লাসে সময়মত আসতে হয় এবং সময়মত চলে যেতে হয় এই ফ্যাসাডটা চালু রাখার জন্য যে শিক্ষাযন্ত্র চালু আছে। ট্র্যাজিকমেডিটা এখানেই – নিউটনের বদলে অন্য শিক্ষক হলে তিনি স্কুলে আসতেনই না, তাই সিস্টেমের ওই নিরেট নিউটনকেই লাগবে।
অতএব ‘নিউটন’-র কাছ থেকে যদি দন্ডকারণ্যের মানুষদের ‘সঠিক’ রাজনীতি (আমার প্রিয় ছাত্রদের কাছে যা হল মাওবাদী সিম্প্যাথেটিক রাজনীতি) চাওয়া হয়, দন্ডকারণ্যের মানুষদের ‘সঠিক’ প্রতিরূপায়ণ চাওয়া হয় – তাহলে ছবিটিকেই ‘নিউটোনিয়ান নিরেট’ হয়ে যেতে হবে, বা ছবির নির্মাতাকে – যিনি ভাবেন যে মেনস্ট্রিমে থেকে ‘ভালোভাবে ছবি করা শিখে’, ‘ভালোমনে ছবি তুললে’ বাস্তব ছবি স্বচ্ছভাবে পর্দায় হাজির হতে পারে। পারে না। তাহলে অ্যাপারেটাসের উপর এমন একটি নির্মল বিশ্বাস রাখতে হয় যা ওই ভোটের কার্যপ্রণালীর উপর ভরসা রাখার মতই। এবং সেই নিরেট নিউটোনিয়ান ফিল্মমেকারকেও কিন্তু হয় ‘বিদেশি’ ফিল্মের জন্য সাজানো নাটক তুলতে হবে, আর শেষমেশ ‘চারজনের বুড়ো আঙুলের ছাপ’ নিয়ে তৃপ্তি পেতে হবে যে সে ‘প্রকৃত’ ছবি পেয়েছে। সেই চারজন তো বুঝবেনই না যে কি হচ্ছে বা না হচ্ছে তাদের নিয়ে, উল্টোদিকে ফিল্মমেকার নিউটন বেদম ক্যাল খেয়ে ঘাড় মটকে বাকি জীবন ঠিক নটায় সিনেমার অফিস এসে ‘সুবোধ বালক’-এর আওয়ার্ড পাবেন। এই ছবির ‘ছবি করার যন্ত্রকল্প’-র উপরই সেই ভরসা নেই।
সেই ছবি এই পরিকাঠামোয় হয়না, তাই এটা দেখিয়ে দেওয়া ভালো যে তা হয় না। ‘নিউটন’ সেটা দিব্যি করেছে।
পুনশ্চ – সায়ন্তন, লাবণ্য, আকাশনীলরা একটা জিনিস করছেন, পরিচালকের (আমি যার নামটাই এখনও ঠিকঠাক মনে রাখতে পারছিনা) সাক্ষাৎকার থেকে ছবিটা পড়ছেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে এতে লাভ হয়না – একটা কারণ তাত্ত্বিক – শিল্পকে ব্যক্তি থেকে আলাদা করা উচিত অনেকক্ষেত্রে, শিল্প ভাষণ নয়। দ্বিতীয়ত, সাক্ষাৎকার শিল্প নয়। ইহজীবনে আমি ছবি বানাতে পারবো কিনা জানিনা, হয়তো কিছু উপন্যাস লিখতে পারবো। কিন্তু তা নিয়ে যদি আমার মিডিয়ার কাছে কথা বলার সৌভাগ্য হয় তাহলে আমি বাজে বকবো, ভুল বলবো, মিসলিডিং কথাবার্তা বলবো, ঢপের কেত্তন শোনাবো, নিজের কাজ মিস্টিফাই করবো, ছবি বেচতে গেলে যা বলা যায় সেইসব বলবো ইত্যাদি। কারণ শিল্প করা হয়ে গেছে, এরপর আর্নেস্টলি কথাবার্তা বলার মানে হয়না। শিল্প করতে গেলে বেশ খাটনি হয়, এরপর সাংবাদিকদের কাছে আন্তরিক হওয়ার কোনো দরকার নেই, তখন ফুল-ফ্লেজেড বানিয়া হওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ কারণ তখন শিল্প হচ্ছেনা আর। এটা আমি জঁ-লুক গোদারের কাছে শিখেছি; গোদার সাধারণ মিডিয়ার কাছে যা কিছু বলেন তা মানলে আজীবন গুলিয়ে থাকবে, তার চাইতে ওর ছবি পড়া ভালো। আর্টিস্টরা মানে বই দিতে চান না, আর প্রায় সব আর্টিস্টই প্রানপাত করার পর ইন্টারভিউয়ের সময়ে নিজেকে আমোদ দেন বা ছবি বেচেন। তাই ইন্টারভিউ দিয়ে ছবি না পড়াই ভালো। আর যারা গোদার নন, অমিত মারুসকার ইত্যাদি, অর্থাৎ কম্পিটেন্ট এবং মোটামুটি বুদ্ধিমান, তারা বেশিরভাগ সময়েই নিজেদের ছবির সম্ভাবনা পুরোটা বোঝেননা, তাই তারা উৎসুক হয়ে থাকেন আমরা কি বলছি তার জন্য।
নিউটন নিয়ে যা লিখলাম, ভাবলাম এবং পড়লাম তা থেকে কয়েকটা অবজারভেশন –
১। আমার একটা ফালতু ঠাট্টা করা পোস্ট হাজারের উপর লাইক পেয়ে আমারই চক্ষুশূল হয়ে উঠেছে। অনেকে এটাকে রিভিউ ভাবছেন! যারা ভাবছেন তারা অনেকেই টালিগঞ্জের সঙ্গে জড়িত, এতেই বোঝা যায় লোকাল সিনেমাবোধের অবস্থা কিন্তু শোচনীয়।
২। আমি নিচে পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকারের একটা ইন্টারভিউয়ের লিংক দেবো। তার প্রথম দশ মিনিট পড়লেই টালিগঞ্জ-প্রেমী যাদের গাত্রদাহ হয়েছে আমার পোস্ট পড়ে তারা বুঝবেন বেটার ওয়ার্ক কালচার কাকে বলে।
৩। অনেক প্যাশনেট, সিরিয়াস সিনেমা-রসিক বুঝতেই পারছেন না যে ‘নিউটন’-এ নিউটন চরিত্রটি নিয়ে ঠাট্টা করা হয়েছে! আমি নিচে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের একটা লেখার লিংক দেবো। লেখাটা জরুরী আমার কাছে কারণ বোঝা যায় যে আমরা বাঙালিরা অনেকগুলি কাস্ট-পলিটিক্সের কোড চিনতে ভুল করি। নিউটন যে উচ্চবর্ণ নয় তাতে ছবির পাঠ ও রাজনীতি ইন্টারেস্টিং মাত্রা পায়। কিন্তু লেখক ভাবছেন যে নিউটন একজন ‘পজিটিভ দলিত হিরো’! এবং তিনি সমালোচনাও করেছেন কেন এই নায়ক-কল্পনা সীমাবদ্ধ। তিনি অনেকের মতই বুঝতে পারেননি যে এই ‘নায়ক’ আসলে সীমাবদ্ধই, সেটা দেখানোই উদ্দেশ্য ছিল।
৪। আমি নিচে যে ইন্টারভিউটা দেবো সেখানে বুঝবেন যে নির্মাতাদের অ্যাপ্রোচটা ছিল রিসার্চের, অর্থাৎ জ্ঞান যোগাড় করার, জ্ঞান ‘দেওয়ার’ নয়। কিছু (বিশেষ করে বাঙালি) রাজনৈতিক সিনেবোদ্ধার সমস্যা হল তারা ভাবেন তারা রাজনীতি বুঝে গেছেন একটা স্টান্স নিয়ে (যেমন তারা সত্যজিৎ রায়ের ছবি বোঝেন ব্যক্তি-সত্যজিৎ সম্পর্কে একটা স্টান্স নিয়ে), অতএব তারা ‘নিউটন’-এ তাদের চেনাজানা কনফার্মড রাজনীতি চান। কিন্তু ক্যামেরা যা আমার মাথায় আছে তা লেখার জন্য সাদা পাতা নয়, ক্যামেরা বা সাউন্ড রেকর্ডার হল যা বাস্তবে আছে তা দেখার ও শোনার জন্য। এর জন্য গবেষণার মোডটাই ভালো যায়। আমি বই পড়ে, স্টান্স নিয়ে ছত্তিশগড় নিয়ে যা বুঝে গেছি তার চাইতে একজন যিনি কিছুই না জেনে জানছেন আস্তে আস্তে সম্পৃক্ত মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে – তার কথা শুনতে আমি বেশি ইন্টারেস্টেড।
৫। দেখা-শোনা-দেখানো-শোনানো-কল্পনা করা – এই প্রতিটার সীমাবদ্ধতা আছে। ছত্তিশগড়ের আদিবাসীদের বাস্তবতা দেখাবো বললেই দেখানো যায় না। যেটা আপনার মনে হচ্ছে ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ সেটা ‘পলিটিকালি ডিটারমাইন্ড’ আপনার স্টান্স দিয়ে, তা থেকে ইন্টারেস্টিং ছবি কীভাবে হবে? যা বই বা প্যাম্ফেলেটের পাতায় লেখা আছে তার দৃশ্যায়ণ আমি দেখবো কেন, বই বা প্যাম্ফলেটটা পড়ে নিলেই হয় – কারণ আপনার শব্দচিত্র তো ডেরিভেটিভ, সেকেন্ডারি। হয় প্রামান্য তথ্যচিত্র করতে হয়, নয়তো তার বদলে আপনি যদি এমন একটা গল্প বলেন যার উদ্দেশ্য হল আমার জাজমেন্টকে সক্রিয় করার (আপনার জাজমেন্টের টেস্টিমনি দেওয়া নয়) – সেটা বেশি চিত্তাকর্ষক হবে। আর বলুন তো, শহরে আজীবন বসে থেকে কেউ কীভাবে বিচার করবে যে একটি ছবিতে আদিবাসী-জীবনের চিত্রায়ণ ‘ঠিক’? তার চেয়ে যে ছবি আমাদের দেখা-শোনা-দেখানো-শোনানো-কল্পনা করাকে প্রশ্ন করতে পারে তা অন্তত আমার কাছে অনেক বেশি গ্রহনযোগ্য


